কোনো এক খান্দারত তিন ভাই একসথে থাকছিল। কিন্তুক উমার ঘরোত বড় অভাব। সংসার আর চলে না, এইমতোন সময়ত বড় ভাইটা ঘর-বাড়ি ছাড়ি ভাগ্য খুঁজিবার বাদে বেরাই গেইল।
যাইতে যাইতে ম্যালা দূরত চলি আইল। তার ঠ্যাং আর চলে না, দম ফুরি গেইসে। ঠিক সইন্ধ্যা সময়ত ওই একটা ভাঙা বড় বাড়ির সামনত আসি পৌছিল। দুয়ারোত টোকা দিতেই একটা দেখিবার বাদে কুৎসিত বুড়ি আসি দুয়ার খুলি দিয়া বড় ভাইয়ের মুখের ভিতি তাকি রইল। বুড়িটা হইল একটা ডাইনী।
বড় ভাই ডাইনীক কইল, "আজি রাইতখান থাকিবার বাদে এঠে একনা আশ্রয় পাওয়া যাইবে?"
"ভিতরত আয়" - কয়া ডাইনীটা উয়াক উপরা যাওয়ার সিঁড়ি দেখি দিল। উপরা উঠি বড় ভাই দেখিল মাটিত একটা মাদুর পড়ি আছে। ওটা বিছাই নিয়া ওই শুতি পড়িল। সারা দিন হাঁটি হাঁটি কাহিল হইসিল, তাই শুতি না শুতিত নিন্দ গেইল।
কতক্ষণ ঘুমাইসে মনে নাই, হঠাৎ মাঝ রাইতোত টুং টাং শব্দোত ঘুম ভাঙি গেইল। তাকাই দেখে মাটির এক কোণাত একটা গাতা মতন, ওইঠে দিয়া আলো আসির ধুকছে। আস্তে আস্তে যাইয়া ওই গাতা দিয়া দেখিল, নিচোত ডাইনী বুড়িটা একটা থলিত সোনার মোহর ভরাছে। পাশোত হারিকেন জ্বলছে। সব মোহর ভরা হইলে ডাইনী বুড়িটা থলিটার মুখ বান্ধি দেওয়ালের তাকের উপরা থুই দিল। তারপর আসি আলোটা কম করি দিয়া নিজের বিছনাত শুতি পড়িল। উপরা থাকি বড় ভাই সব দেখিবার পাইল। কিছুক্ষণ পরেই ডাইনী বুড়ির নাক ডাকার শব্দ শোনা গেইল।
বড় ভাই আস্তে আস্তে নিচোত নামিল। ঘরের দুয়ারটা ভেজানো আছিল, আস্তে ঠেলা দিতেই খুলি গেইল। ঘরোত ঢুকি তাক থাকি থলিটা নিয়া ওই রাস্তাত বেরাই পড়িল। তারপর দৌড় শুরু করিল।
দৌড়াইতে দৌড়াইতে ওই একটা খেরি ঘরের সামনত আসিল। ওঠে আসিতেই ঘরটা উয়াক কইল - "ভিতরোত বড্ড ময়লা জমি আছে, একনা সাফা করি দিবু?"
না - উত্তর দিল বড় ভাই, "মোর খাড়া হইবার সময় নাই।" কয়া আবার দৌড় শুরু করিল।
সকাল হই গেইসে। সূর্য্য উপরা উঠবার ধইচ্চে। দৌড়াইতে দৌড়াইতে ওই একটা মাঠের কাছত আসি পৌছিল।
উয়াক দেখি মাঠ কইল - "ভাই, মোর আশপাশোত বড্ড ঝোপ-জঙ্গল হই গেইসে, একনা সাফা করি দিবু?"
না, পারিম না - কয়া ওই আবার দৌড় শুরু করিল। কিন্তুক আর পারিল না। এ্যাকটু যাইতেই মনে হইল থলিটা যেন দুগুণ ভারী হই গেইসে।
কিছুক্ষণ পর ওই একটা ইন্দারার কাছত আসি পৌছিল। দৌড়াইতে দৌড়াইতে বড্ড পিয়াস লাগিসে। তাই জল খাবার বাদে আগাই গেইল। ইন্দারা কইল, "মোর গাওত শেওলা জমিসে, একনা সাফা করি দিবু?"
তখনি জবাব দিল বড় ভাই, "না, মোর একনা সময় নাই।" এই কথা কয়াই আবার চলা শুরু করিল।
দুপুর বেলা ওই একটা বটগাছের তলোত আসি পৌছিল। ওই গাছের ছায়াত বসি জিরাইবার ধইচ্চে।
এইদিকে সকাল বেলা ডাইনী বুড়ি ঘুম থাকি উঠি দেখে, ছাওয়াটাও নাই, তার সোনার থলিটাও নাই। তখন ওই বেরাই পড়িল খুঁজিবার বাদে। যাইতে যাইতে ওই খেরি ঘরের কাছত আসি পৌছিল। উয়াক পুছিল -
"থলি ঘাড়ত এক ছাওয়া,
মোর যত টাকা-কড়ি,
নিয়া গেইসে চুরি করি,
পাইম উয়াক কোনঠে গেইলে?"
ঘর উয়াক কইল - "মাঠের পাকে গেইসে চলি।"
ডাইনী তখন আবার মাঠের পাকে চলিল। ওঠে যাইয়া পুছিল -
"থলি ঘাড়ত এক ছাওয়া,
মোর যত টাকা-কড়ি,
নিয়া গেইসে চুরি করি,
পাইম উয়াক কোনঠে গেইলে?"
মাঠ উয়াক কইল -
"মাঠ পেরাইয়া ইন্দারার ধারোত,
গেইলে ওঠে পাবার পারিস।"
ডাইনী ইন্দারার কাছত আসি পুছ করিল -
"থলি ঘাড়ত এক ছাওয়া,
মোর যত টাকা-কড়ি,
নিয়া গেইসে চুরি করি,
পাইম উয়াক কোনঠে গেইলে?"
এই কথা শুনি ইন্দারা জবাব দিল -
"বটগাছটা আছে যেইঠে,
পাবু উয়াক গেইলে ওইঠে।"
ডাইনী বুড়ি তাড়াতাড়ি বটগাছের পাকে চলিল। ওঠে যাইয়া দেখিল, বড় ভাই থলিটা মাথাত নিয়া পরম সুখে ঘুমি আছে। ডাইনী এক মুঠ ধুলা মন্ত্র পড়ি বড় ভাইয়ের পাকে ছুড়ি মারিল। চোখের নিমিষোত বড় ভাই উধাও হই গেইল। পড়ি রইল খালি সোনা ভর্তি থলিটা। ওটা কান্ধে নিয়া বুড়ি বাড়ির পাকে ফিরি গেইল।
কিছুদিন পর মাইঝলা ভাই দেখিল এইমতন করি আর থাকা যায় না। এত কষ্ট করি বাঁচি থাকার কোনো মানে হয় না। ওইও সব ছাড়ি দিয়া বেরাই পড়িল, যদি ভাগ্য ফেরে।
হাঁটতে হাঁটতে সইন্ধ্যা সময়ত মাইঝলা ভাইও সেই ডাইনী বুড়ির বাড়ির সামনত আসি পৌছিল। দুয়ারোত টোকা দিতে বুড়ি বেরাই আইল।
"আজি রাইতটা থাকিবার পাম?" জিজ্ঞাসা করিল মাইঝলা ভাই। "ভিতরত আয়" - কয়া বুড়ি উয়াক উপরা যাওয়ার সিঁড়ি দেখি দিল। ওইও উপরা যাইয়া মাদুর দেখি শুতি পড়িল। সারা দিন হাঁটি কাহিল হইসিল, তাই শুতি না শুতিত নিন্দ গেইল। মাঝ রাইতোত টুং টাং শব্দোত ঘুম ভাঙি গেইল। গাতা দিয়া আলো আসা দেখি তাকাই দেখিল, বুড়ি থলিত সোনার মোহর ভরাছে।
বুড়ি ঘুমি পড়িলে আর নাক ডাকার শব্দ শুনি নিচোত নামি থলিটা নিয়া দিল দৌড়।
দৌড়াইতে দৌড়াইতে সেই খেরি ঘরের কাছত আসিতে, ঘর কইল, "ভিতরটা বড্ড নোংরা হই আছে, সাফা করি দিবু?"
"না, মোর সময় নাই" - কয়াই আবার দৌড়াইল মাইঝলা ভাই।
"মোর আশপাশের ঝোপলা সাফা করি দিবু?" - কইল মাঠ।
"না, মোর খাড়া হইবার সময় নাই" - জবাব দিল মাইঝলা ভাই।
"ভাই, মোর গাওয়ের শেওলাগিলা সাফা করি দিবু?" - কইল ইন্দারা।
"বাজে কামের সময় নাই মোর" - কয়া ওইও বড় ভাইয়ের মতন গাছের তলোত যাইয়া জিরাইতে জিরাইতে নিন্দ গেইল।
ওইদিকে সকাল বেলা ডাইনী বুড়ি যখন দেখিল, তার থলি আর অতিথি দুইটাই উধাও, তখন রাগে গর গর করি ছাওয়াটাক খুঁজিবার বাদে ছুটি চলিল। রাস্তার মাঝোত সেই ঘর, মাঠ আর ইন্দারা আগের মতনই মাইঝলা ভাইয়ের খবর দিয়া দিল। মাইঝলা ভাইকেও মন্ত্র পড়ি ধুলা ছিটাইয়া অদৃশ্য করি দিল আর সোনার থলি নিয়া বাড়ি ফিরি গেইল।
এইবার ছোট ভাই একলায় থাকে। কোনোমতে দিন চলে। শেষোত এমন সময় আইল যে, আর দিন কাটে না। এইমতন চলতে চলতে ওইও সংসারোত বিতৃষ্ণা আসি গেইল। তখন ওইও একদিন বেরাই পড়িল ভাগ্য খুঁজিবার বাদে। তারপর যাইতে যাইতে ওইও সেই ডাইনীর বাড়ির কাছত আসি পড়িল আর ওইও রাইতের বাদে আশ্রয় পাইল। বহুত রাইতোত ঘুম ভাঙি থলি ভর্তি মোহর দেখি, বুড়ি ঘুমাইলে ওইও সেটা নিয়া দৌড় দিল।
যাইতে না যাইতে ওই খেরি ঘরের কাছত আসি পৌছিল। ঘর উয়াক কইল, "ভিতরোত বড্ড ময়লা জমি আছে, সাফা করি দিবু ভাই একনা?"
এই ছোট ভাইটা আছিল ভারী পরোপকারী, কাওক কোনোদিন 'না' কয় না। ওই কথা শুনি কইল, "হ্যাঁ, দিম।" সাফা করিতে যদিও সময় লাগিল, তবুও ওই ভাল করি সব ময়লা সাফা করি দিল। তারপর আবার দৌড় শুরু করিল যতক্ষণ না মাঠের কাছত আসি পৌছিল।
"মোর আশপাশের ঝোপলা সাফা করি দিবু?" কইল মাঠ। ছোট ভাই না করিল না। ওই মাঠের চাইরপাশ সাফা করি দিল, আগাছা, ঝোপ-ঝাড় সব তুলি ফেলাই দিল। তারপর ডাইনী বুড়ি আসি পড়িবে এই ভয়ে দৌড় শুরু করিল। দৌড়াইতে দৌড়াইতে সেই ইন্দারার ধারোত আসি পৌছিল। উয়াক দেখি ইন্দারা জিজ্ঞাসা করিল, "মোর গাওয়ের শেওলাগিলা একনা সাফা করি দিবু ভাই?"
এইবারও ছোট ভাই 'না' কইল না। যদিও বড্ড ভয় হইছিল যে, ডাইনী বুড়ি আসি উয়াক ধরি ফেলাইবে, তবুও ওই ভাল করি ইন্দারার গাওত জমা শেওলাগিলা সাফা করি দিল। তারপর দুপুর বেলা কাহিল হইয়া ওই বটগাছটার তলোত যাইয়া জিরাইবার ধইচ্চে।
এইবার ডাইনী বুড়ি সকাল বেলা ঘুম থাকি উঠি ছোট ভাই আর তার সোনার মোহরের থলি কোনোটাই দেখির পাইল না। তখন ওই বিজলীর মতন ফাটি পড়িল। ছুটি চলিল ছোট ভাইয়ের খোঁজোত। যাইতে যাইতে সেই খেরি ঘরের কাছত আসি পুছ করিল -
"থলি ঘাড়ত এক ছাওয়া,
মোর যত টাকা-কড়ি,
নিয়া গেইসে চুরি করি,
পাইম উয়াক কোনঠে গেইলে?"
খেরি ঘর উয়াক কিছু কইল না। কিন্তুক হঠাৎ ঝড়ের মতন ঘরের চালাটা উড়ি আসিল ডাইনী বুড়ির পাকে। বাঁশগিলা পটাপট খুলি যাইয়া পড়িল বুড়ির ঘাড়োত। ডাইনী বুড়ি ছোটাছুটি করিয়াও রেহাই পাইল না, অবস্থা খারাপ হই গেইল। কোনোমতে বাঁচি খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে আগাই চলিল বুড়ি। থামিল আসি মাঠের কাছত। পুছ করিল উয়াক -
"থলি ঘাড়ত এক ছাওয়া,
মোর যত টাকা-কড়ি,
নিয়া গেইসে চুরি করি,
পাইম উয়াক কোনঠে গেইলে?"
মাঠ ওর উত্তরে ধুলার ঝড় উড়াইয়া ডাইনী বুড়িক প্রায় অন্ধ করি দিল। ওই চোখ ঢাকে তো ধুলা ঢোকে মুখোত, মুখ ঢাকিলে চোখোত। অতিষ্ঠ করি তুলিল উয়াক।
তারপর ইন্দারার কাছত গেইল ডাইনী। উয়াক কইল -
"থলি ঘাড়ত এক ছাওয়া,
মোর যত টাকা-কড়ি,
নিয়া গেইসে চুরি করি,
পাইম উয়াক কোনঠে গেইলে?"
ইন্দারা কিছু কইল না, কিন্তুক ওর জল হঠাৎ বাড়ির ধইচ্চে। বাড়িতে বাড়িতে ঠান্ডা হাত দিয়া বুড়িক টানি নিয়া ভিতরোত ফেলাই দিল। ডাইনী বুড়ি জলে ডুবি কোণঠে তলাই গেইল।
ছোট ভাই বাড়ি ফিরি গেইল। তারপর সেই মোহর নিয়া সুখে ঘর-সংসার করিবার ধইচ্চে।
* একটি বিদেশি উপকথা অবলম্বনে।
[ মৌচাক, আষাঢ় ১৩৬৫ (জুন ১৯৫৮)]
বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ
হালিচা:
ভুতের গপ্পো