মুই যে কাহিনীখান কবার নাগছোং, এইখান ম্যালা বছর আগেকার মোর নিজের চোখে দেখা একখান সাচা ঘটনা। যে পরিবারত এই ঘটনাখান ঘটিছিল, তার বংশের মানষি এলাও অনেকেই বাঁচি আছে, সেই জন্যে মুই উমার আসল নাম-ধাম কইম না। তাতে গল্পের কোনো ক্ষতি হইবে না। উমরা আছিল হামার নিকট আত্মীয়।
উমরা আছিল বড়লোক গিরস্থ। পচ্চিমের কোনো এক শহরত থাকে। দুই ভাই। বড় ভাই যোগেনবাবু ওইঠেকার নামকরা উকিল, আর ছোট ভাই নামকরা ডাক্তার। দুই ভাই মিলি অনেক টাকা কামাই করে। ওইঠেকার সমাজত দুই ভাইয়ের খুব নাম-ডাক আছিল।
সংসারখানও আছিল বহুত বড়। বুড়া বাপ-মাও, দুই ভাইয়ের দুই বউ, পত্তেকের পাঁচ-ছয়টা করি ছাওয়া-পোয়া, এক বুড়ি বিধবা বইন, তারও চাইর-পাঁচটা ছাওয়া। তার মইধ্যে আবার কাহোর বিয়াও হইছে, তার বউ-ছাওয়া আছে। এছাড়া চাকর-বাকর, ঝি-চাকরানি, পাচক, মুহুরি, কম্পাউন্ডার, সরকার, গোমস্তা মিলি সংসারখান একেবারে গমগম করি থাকে।
এই বড় সংসারের যাই গিন্নি আছিল, সগায় উয়াক 'বড়মা' বলি ডাকাইছিল। উয়াই হইল যোগেনবাবুর বউ। বড় সংসারের ছোট-বড় সউগ খুঁটিনাটি কাম উয়াকেই দেখা নাগে। বিহান পাঁচটা থাকি রাত এগারোটা পর্যন্ত উয়ার কামের শ্যাষ নাই, যদিও বিধবা ননদ কাদম্বিনী দেবী সউগ কামত উয়াক সায্য করে। কিন্তু এক বছর হঠাৎ বড়মা কলেরা ব্যামোত ধরি মরি গেইল।
মরি যাওয়ার কিছুদিন পর একখান আজব ঘটনা ঘটিল। যমুনা নামে এক বয়স্কা কামের বেটিছাওয়া বহুদিন থাকি ওই বাড়িত কাম করে। কয়েকটা ছোট ছোট ছাওয়া-পোয়া নিয়া রাতিত সে দোতলার একটা ঘরত শোয়। একদিন রাত দুই-আড়াইটার সমায় উয়াক বাহিরত যাওয়া নাগে। ঘরের বাহিরত একখান খোলা লম্বা টানা বারান্দা আছিল। ওই বারান্দার শ্যাষ মাথাত মুখ-হাত ধোয়ার ঘর আছিল। বাড়িখান আছিল সেকালের চক-মেলানো বাড়ি, মানে মাঝত একখান উঠান ফেলেয়া চাইরো পাকে চাইর সারি ঘর, আর ভিতর পাকে খোলা টানা বারান্দা। উপরত দোতলাও একে নাখান। দোতলাত ওই টানা বারান্দার দুই কোনাত দুইখান মুখ-হাত ধোয়ার ঘর আছিল। ওইদিন রাতিখান আছিল জোৎসনা রাতি।
যমুনা বাথরুম থাকি বাইরেয়া আইসা, উল্টা পাকের বারান্দাত চাইতে না চাইতে বিকট করি একখান চিৎকার দিয়া অজ্ঞান হইয়া পড়ি গেইল। তার চিৎকারে সগারে ঘুম ভাঙি গেইল। সগায় দৌড়ি আইসে। ছোট ভাই দ্বিজেনবাবু ডাক্তার আছিল, তার চেষ্টায় তাড়াতাড়ি যমুনার জ্ঞান ফিরি আইসে। তারপর একটু ভাল হইয়া যমুনা যা কইল, কাহো বিশ্বাস করিল, কাহো হাসি উড়ি দিল। যমুনা কইল, সে ওইপারের বারান্দাত, বড়বাবুর শোয়ার ঘরের জানালা ধরি বড়মাক খাড়া হইয়া থাকা দেখিছে।
সেদিন সগায় কথাটা হাসি উড়ি দিল বটে, কিন্তু কয়েকদিন পর যখন পিসিমা মানে যোগেনবাবুর বিধবা বইন কইল যে, কালি রাতি হঠাৎ ঘুম ভাঙি গেইলে, খোলা জানালা দিয়া বড় বউক ওইপারের বারান্দার রেলিং ধরি খাড়া হইয়া থাকা দেখিছে, তখন সগার মনে ডর আর চিন্তার কালা ছায়া পড়ি গেইল। তখন আর কাহো কথাটা উড়ি দিবার পারিল না।
তারপর থাকি এই নাখান ঘটনা খুব ঘন ঘন ঘটা ধরি গেইল। বাড়ির অনেকেই 'বড়মা'ক যেটে-সেটে দেখা পাওয়া ধরি গেইল। কেতো ছাদের আলসেত ঠ্যাং ঝুলি বসি আছে, কেতো রেলিং ধরি খাড়া হইয়া আছে, কেতো যোগেনবাবুর শোয়ার ঘরের এক কোনাত লালপাড় শাড়ির ঘোমটা দিয়া বসি আছে। দিনের পর দিন এই নাখান হইতে থাকায়, সগার আগের ডরখান অনেকটা কাটি গেইল বটে, কিন্তু একটা অশুভ চিন্তায় সগায় উদাস আর ব্যাকুল হইয়া পড়িল।
হিতাকাঙ্খী বন্ধু-বান্ধব সগায় নানান বুদ্ধি দিল। তার মইধ্যে বেশিরভাগই কইল - "শিগগির করি গয়াত যাইয়া পিন্ডদান দিয়া আইসো।" সেই নাখান করিবে বলি ঠিক হইল আর তার জোগাড়-যন্তর চলিবার নাগিল।
কিন্তু কয়েকদিন পর, কাদম্বিনী দেবীর বড় ব্যাটা সুরেশ রাত পেরায় এগারোটার সমায় যখন বাইর বাড়ির সিঁড়ি দিয়া দোতলাত উঠি, ওইপারের বারান্দা পার হইয়া এইপারের বারান্দার পাকে আসোছিল, তখন সাফ দেখিল যে, বারান্দার একপাকে তার বড় মামি খাড়া হইয়া আছে আর উয়াক কবার নাগছে - "সুরেশ, ওইলা তোরা কি মতলব করিছিস? কিছু করিস না বাবা, ওতে কোনো ফল হইবে না।" - কথাখান কয়া শ্যাষ হইতে না হইতে আর উয়াক দেখা গেইল না।
তারপর গয়াত যাইয়া পিন্ডদানও হইল, আরও অনেক কিছুই হইল, কিন্তু ফল কিছুই না হইল। এদিকে যোগেনবাবুর শরীল দিনে দিনে শুকা যাওয়া ধরি গেইল। অথচ তার কোনো নির্দিষ্ট ব্যামোর লক্ষণ দেখা গেইল না।
তখন আত্মীয়-স্বজনের পরামর্শে ঠিক হইল যে, এই অবস্থায় এই জাগা ছাড়ি কলকাতাত যাইয়া থাকাই ভাল। এক মাসের মইধ্যে সগায় কলকাতা চলি আইসে।
কলকাতাত আসিয়াও অবস্থার কোনো বদল না হইল। পচ্চিমের বাড়ির নাখান এইঠেও 'বড়মা'ক সগায় দেখা পাওয়া ধরে। এদিকে যোগেনবাবুর শরীলও দিনে দিনে আরও শুকা যাওয়া ধরে। কলকাতার তখনকার বড় বড় ডাক্তার দেখা হইল, কিন্তু তার শরীল দিনে দিনে ভাঙিয়াই যাওয়া ধরে। কোনো ব্যামোর লক্ষণই তার গাওত পাওয়া গেইল না, খালি দুর্বলতা। এদিকে 'বড়মা'র ব্যাপারেও অনেক কিছু করা হইল, অনেক নামকরা রোজা-ওঝা আনানো হইল। উমরা অনেক ঝাড়-ফুঁক, অনেক কান্ড-কারখানা করিল, কিন্তু ফল - যেলা আগোত আছিল, এলা ওই নাখান।
শ্যাষে যোগেনবাবু একেবারে বিছানাত পড়ি গেইল। বিকাল হইলে রোজ একটু করি জ্বরও আইসা ধরে। এই জ্বরের সূত্র পায়া, ডাক্তারগুলা একটু কূল পাইল। নতুন করি চিকিৎসা চালা ধরে। কিন্তু কিছুতেই যোগেনবাবুক ভাল করি তোলা গেইল না। তার অবস্থা দিনে দিনে আরও খারাপ হইয়া যাওয়া ধরে।
এই সমায়ত মুই মোর ঠাকুমার সাথে উমার বাড়িত যাইয়া পনেরো দিন থাকোং। আগোতেই কইছোং, উমরা হামার আত্মীয় হয়। উমরা পচ্চিমে থাকে বলি আত্মীয়তাত একটু ভাটা পড়িছিল, কিন্তু কলকাতা ফিরি আইসলে আবার যাওয়া-আসা বাড়ি যায়। যোগেনবাবুর অসুখ বাড়িছে শুনি, ঠাকুমা উয়াক দেখির গেইল। মোর তখন ছোট বয়স, বোধ হয় ১২ কি ১৩ বছর হইবে।
ঠাকুমা যোগেনবাবুর ঘরত যাইয়া খাড়া হইতে, উনি ঠাকুমাক কইল - "পিসিমা, এমরা মোক বাঁচাবার বাদে খামোখা চেষ্টা আর টাকা-পাইসা খরচ করিছে, মোক যাওয়াই নাগিবে।"
আগের নাখান এলা সগায় 'বড়মা'ক দেখা পায়। এই জিনিসখান এলা সগার গা-সওয়া হইয়া গেইছে, সেই জন্যে আগের নাখান আর কাহো ডরায় না। বিশেষ করি এই সমায়ত, ব্যাপারখান যেন রোজকার ঘটনা হইয়া গেইছে। তবে এই ব্যাপারের জন্যে কাহো মনে শান্তি নাই, অথচ শান্তি পাওয়ার আশায় সউগ পথে যাইয়াও শ্যাষে পথ হারাছে। খালি একজনের একটা বুদ্ধি নাখান কাম করা হয় নাই। উনি কইছিল, ভারতের বাহিরত, কোনো দূর দেশত যোগেনবাবুক পাঠে দিবার। বাড়ির সগারে ইচ্ছাও হইছিল, কয়েক মাস ইংল্যান্ডত উয়াক রাখিবার। কিন্তু এই ব্যবস্থা প্রথমে হইলে হয়তো হইতে পারিল হয়, এলা তার শরীলের যে অবস্থা, তাতে ইচ্ছা হইলেও আর সম্ভব না হয়। এলা উয়াক জাহাজত তুলিলে, হয়তো জাহাজের মইধ্যেই মরি যাইবে।
ঠাকুমার সাথে যে কয়দিন ওই বাড়িত আছিলোং, তার মইধ্যে মুই দুইদিন 'বড়মা'ক দেখা পাইছোং, কিন্তু বেশি ডরাও নাই। কারণ ভূত-প্রেতের হাত-পাও, 'ন্যাকা সুরে' কথা কওয়া নিয়া তোমার ছোট মনে যে নাখান একটা বিকট ছবি আঁকা আছে, এইটার সাথে তার কিছুই মিল নাই। এইটা যেন বাড়ির আর দশটা মানষির নাখান একজন মানষির নাখান চেহারা, মানষির নাখান কথা, মানষির নাখান গলা। বাড়ির গিন্নির নাখান তার সউগ বিষয়ে গিন্নিপনা। টকটকা লাল পাড় শাড়ি পিন্দা, হাতত বালা, নোয়া, মাথাত সিন্দুর - এই যেন জ্যান্ত 'বড়মা' তার বহুদিনের হাতে গড়া বড় সংসারখানের সউগ দিক সউগ খুঁটিনাটি কাম বহুত মায়া-মমতা দিয়া চালাছে। সেই সূত্রে এক রাতি বিমলা নামে এক কম বয়সী কামের বেটিক কইল, "দ্যাখ বিমলি, ন-বউমার ছোট ছাওয়াটা দিনে দিনে শুকি যাছে। ওর কৃমি হইছে। ঠাকুরপোক কইস ওর ওষুধের ব্যবস্থা করি দিবার।" একদিন দ্বিজেনবাবুর বউক কইল, "ওরে ছোট, নিমুর কোলের বেটিটা রোজ মাঝ রাতত কান্দি কান্দি হুকরি যাওয়ার নাখান হয়। ওর মাও কি মরি ঘুমায়? ওই সমায় উঠি বসি বেটিটার গলাটা একটু ভিজে দিবার পারে না? কি ঘুম রে বাবা! কইস তো ছোট, ওর মাক।" - এই নাখান বাঁচি থাকিতে যেমন সউগ দিকে নজর আছিল, মরি যাইয়াও তেমন সউগ দিকে নজর। তার মইধ্যে বেশি নজর - ভাতারের দিকে। ন-বউমার ছোট ছাওয়ার ওষুধের ব্যবস্থা করে। নিমুর কোলের বেটির প্রতিও সতর্ক নজর, কিন্তু ভাতার যে দিনে দিনে মরার পথত আগাছে, সেই বিষয়ে তার কোনো খেয়াল নাই, দুঃখ নাই, অস্থিরতা নাই, খালি আছে একটা গভীর টান। অথচ তখন যোগেনবাবুর এমন অবস্থা যে, কবে কোনদিন তার হয়তো কি ঘটে!
কয়েকদিন পর ঘটিলও তাই। হঠাৎ একদিন মাঝরাইতত যোগেনবাবু চিরদিনের জন্যে চোখ বুজিল।
আচরিত কথা এই যে, সেইদিন থাকি আর কোনোদিন ওই বাড়িত 'বড়মা'ক দেখা যায় নাই।
[মৌচাক, শারদীয়া ১৩৬৫ (১৯৫৮)]
বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ
হালিচা:
ভুতের গপ্পো