মড়া কাটিবার ভয় – শ্রীমোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়

ডাক্তারি কলেজত পড়িবার সমে ক্যানে যে মুই হঠাৎ করি ডাক্তারি পড়া ছাড়ি দিলুং, তার আসল কারণখান কাহোঁয়ে জানে না। কাকো মুই কঁও নাই। তখুন কবার মোর কোনো উপায়-এ আছিল না, কইলেও হয়তো কাহোঁ বিশ্বাস করিলে হয় না।

গুরুজনগুলা জানিচিল— মড়া কাটিবার ডরে মুই ডাক্তারি পড়া ছাড়ি দিছুঁ। পাড়া-পড়শির মনত আছিল মুই অকর্মা, ফাঁকিবাজ— ওইটায় আসল কারণ। অন্তরঙ্গ বন্ধুগুলা কোনো কারণ-এ খুঁজি পায় নাই, ক্যানে ডাক্তার হবার এমন একখান সুযোগ মুই অবহেলাত নষ্ট করনু। আসলে মড়া কাটিবার ডরে-এ মুই ডাক্তারি পড়া ছাড়িচিলুং, কিন্তুক আত্মীয়গুলা যেমন করি ভাবিচিল তেমন করি নোহায়। ব্যাপারখান তে গোড়ার থাকি-এ কং।

ডাক্তারি কলেজের পইলা বছর শেষের দিকত হামার হাড্ডি-বিদ্যার পাঠ শুরু হইল। এক বাক্স মরা মানষির হাড্ডি কিনি মোর খাটের পাছের আলমারির মাথাত থুই দিলুং। বাড়ির বুড়ি ঝি, যে ছোট থাকি হামাক সগাকে মানষি করিচে, সে রাইতক মোর ঘরের দুয়ারের আগত মাদুর পাতি শুতিলেক। যেই দিন থাকি জানিল ঘরত আলমারির মাথাত মরা মানষির হাড্ডি আছে, সেই দিন থাকি সে মোর ঘরের মেঝেত শোয়া ছাড়ি দিলেক।

মুই কনু— ‘কী হইল রে বুড়ি?’

বুড়ি কইল— ‘না বাপো, রাইতক ভয় করে। কই আগত তো করিলেক না।’ মুই কনু— ‘কিসের ভয়?’

—‘তা জানং না বাপো। ওই বাক্সের ভিতরত খড়খড় করে শুনিবার পাও না?’

মুই কনু— ‘ইঁদুর-টিদুর হইবে হয়তো। তাতে আর ভয় কী?’

বুড়ি ফোঁস করি কইল— ‘এই ঘরত আবার ইঁদুর আসিবে কুন থাকি? বিলাই ঘুরি বেড়ায় দেখিবার পাও না? বিলাইক কি মাছ-ভাত খুয়াং না?’

মুই কনু— ‘বুড়ি, তোর কোনো ভয় নাই। এই তো মুই ঘুমাং, মোর তো কিছু হয় না।’

বুড়ি কইল— ‘তোমারগুলার বুকের পাটা বাপো। তোমরা বড় বড় ডাক্তার হবা, তোমারগুলার কাথা আলাদা। মুই আর ওই ঘরত শুতিবার পাং না।’

সেই থাকি বুড়ি রাইতক অন্য ঘরত শুতিলেক।

হাড্ডি-বিদ্যার বইয়ের সাঁথে মিলি মিলি মোক হাড্ডিগুলার চর্চা করির নাগিলেক। বুড়ি যখুন উঁকি মারি দেখিবার আসিলেক একখান মড়ার হাড্ডি বড় যত্ন করি কোলাত থুই মুই তার উপর পেন্সিলের দাগ মারেচুং, তখুন সে মোক নব্য-ডাক্তার না ভাবি কাপালিক-টাপালিক কিছু একটা ভাবিলেক নিশ্চয়।

যাই হোক, এমন করি হাড্ডি চর্চা করিতে করিতে শেষত হামার মড়া দেহ চর্চার সমে আসিল। ক্লাসের ছাওয়াগুলাক জোড়ায় ভাগ করি পত্যেক দুইজন ছাত্রের বাদে একখান করি মড়া দিলেক। ছাওয়াগুলা শান দিয়া ছুরি আর সন্না হাতত নিয়া বসি গেইলেক চিরি দেখিবার।

ক্যানে জানং না, সেই বছর যথেষ্ট মড়া পাওয়া যাবার ধরিচিল না। তাই মুই আর মোর বন্ধু অজিত পইলাতে কোনো মড়া-এ পাই নাই। একটার পাছত একটা মড়া আসি মড়া-কাটা ঘরের এই কোণ থাকি ওই কোণ তক জমা হইতে নাগিল— অজিত আর মুই তখুনও খালি হাতত বসি।

অজিত ছাওয়াটাক মুই ডাক্তারি কলেজত ভর্তি হবার আগত চিনিচিলুং না। কিন্তুক এঠে ভর্তি হইতে-এ তার সাঁথে মোর খুব বন্ধুত্ব হইল। কবার গেইলে, ডাক্তারি কলেজত সেই মোর শ্রেষ্ঠ বন্ধু আছিল। অজিতের সাঁথে আলাপ হবার কিছুদিন পাছত মুই একদিন উমার বাড়ি গেইচিলুং। অজিতের দুই দিদি সুনীতি আর প্রকৃতি তখুন উমার আসন্ন এম. এ পরীক্ষার পড়া নিয়া খুব ব্যস্ত। অজিতের থাকি উমরা তিন-চার বছরের বড়। দুই বইনের বয়সের ফারাক এক বছর হবে, কিন্তুক দুইজন-এ বরাবর স্কুল আর কলেজত এক-এ ক্লাসত পড়ি আসিচে, তাই এম. এ পরীক্ষাও দেচে এক-এ সাঁথে।

এমন সুন্দরী ছাওয়া মোর খুব কম-এ চোখত পড়িচে, হয়তো দেখি-এ নাই কখুনো। হামার বাড়িত আর আত্মীয়াগুলার ভিতরত যায় যায় বেশ নাম করা সুন্দরী, উমরাও এই দুই বইনের তুলনাত কিছু নোহায়। বিশেষ করি অজিতের ছোটদি প্রকৃতির তুলনা মেলা ভার। মুই সত্যি মুগ্ধ হই গেইচিলুং অচিনা বাড়িত পইলা দিন আসি-এ ছাওয়াগুলার মুখের দিকত যে বোকার নাকান তাকাবার নাগে না সেটা মনত আছিল না। মনত পড়িতে-এ হঠাৎ এমন লাজ পালুং যে মোর মাথা নিচু হই গেইল, আর উঠিবার চায় না। শেষত অজিতের দিদিগুলা যখুন গরম লুচি, বেগুন ভাজা আর মিঠাই নিয়া হামার দুইজনক খুয়াবার আসিলেক আর উমার মিঠা স্বভাবের গুণে মুহূর্তত মোক আপন করি নিলেক, তখুন সত্যি মনত হইল সুনীতি আর প্রকৃতি এই দুইটা মোর-এ দিদি— কতকাল যেন উমার সাঁথে-এ একসাঁথে মানষি হইচুং।

মোর নিজের চার দিদি— কিন্তুক কারো সাঁথে-এ মোর ভাব নাই। দিদিগুলা কত সমে কত জিনিস মোক দিচে, ভাইফোঁটার সমে কত কী রান্ধি খুয়াইচে, কিন্তুক কখুনো মুই উমার প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করিচুং না। সেজদি আর ছোটদিক তো ছোট থাকিতে কত ঠেঙ্গাচুং। বড়দি মেজদির বয়সটা একটু বেশি হবার তানে উমার নাগাল পাং নাই, নইলে বোধায় উমাকও পিট্টি দিলুং হয়। এই নিয়া কত ঝগড়া, কত কান্দাকাটি হইচে। মারামারি ঝগড়ার বাদে কখুনো মোর খেদ হয় নাই। সেই দিন কিন্তুক সেই লুচি আর বেগুন ভাজার থালা নিয়া মোর মন কৃতজ্ঞতাত নুই পড়িলেক। সেই দিন থাকি মুই অজিতের বাড়ির আর এক ছাওয়া হই গেলুং।

বাড়িত আসি দিদিগুলাক কনু মোর নতুন দিদিগুলার কাথা। উমরা তো হিংসায় জ্বলি মরিলেক। সেজদি কইল— ‘হ্যাঁ, থুই দে তোর প্রকৃতি দি! ছোট পিসির থাকি সে সুন্দরী নাকি? ওই তো দেখিচুং তোর অজিতক। ওর-এ তো বইন, কত আর হইবে?’

জানিচিলুং দিদিগুলার মনত অসীম আগ্রহ জাগিবে। অজিতের দিদিগুলাক দেখিবার বাদে সগায় ছটফট করি উঠিবে। মুইও তাই বাড়াই বাড়াই উমার গুণ বর্ণনা করনু। শেষত ঠিক হইল সুনীতিদি আর প্রকৃতিদির পরীক্ষা হই গেইলে একদিন উমাক আর অজিতক হামার বাড়িত নেমন্তন্ন করা হইবে। মুই গিয়া কই আসনু। সুনীতিদি প্রকৃতিদি তখুন-এ রাজি হই গেইলেক।

কিন্তুক ওই রাজি হওয়া তক-এ হইল; হামার বাড়িত আসা বা দিদিগুলার সাঁথে আলাপ হওয়া, কিছু-এ হই উঠিল না।

সুনীতিদিগুলার পরীক্ষা শেষ হবার আগ থাকি-এ জরুরি তাগিদ আসিবার ধরিচিল উমার মীরাট-বাসী মাসির ঠে থাকি, যাতে পরীক্ষা দিয়া-এ উমরা মীরাটত আসে। মাসি উত্তর-ভারত ঘুরিবার বাদে দিন ঠিক করি বসি আছে, বইনঝিগুলা আসিলে-এ উমাক নিয়া বাইর হবেন। সুতরাং সুনীতিদি প্রকৃতিদির পরীক্ষা যেই দিন শেষ হইল, সেই দিন-এ রাইতের ট্রেনত দুই বইন চলি গেইলেক মীরাটত। কাথা দিয়া গেইলেক, ফিরি আসি হামার বাড়িত যাবেন।

তার পাছত-এ ঘটিল সেই ভয়ানক দুর্ঘটনা। উত্তর-ভারত ঘুরিবার সমে এক আন্ধার রাইতক নির্জন এক নদীর ধারত উমার ছুটন্ত ট্রেন লাইন ফসকি জলের উপর উলটি পড়িল। ট্রেন যাত্রীর ভিতরত কতজন যে মরি গেইল তার সঠিক কোনো হিসাব পাওয়া গেইল না। প্রকৃতি আর মাসিমার কোনো পাত্তা-এ পাওয়া গেইল না। খালি সুনীতিদি পনেরো দিন হাসপাতালত ভুগি মাথাত পট্টি বান্ধি কলকাতাত ফিরি আসিল। পট্টি যখুন খোলা হইল তখুন দেখা গেইল তার একটা চোখ আর নাই। তা ছাড়া সুন্দরী বলি তাক আর চিনা যায় না। কোনোদিন যাবেও না। সুনীতিদির মুখ দিয়া বাইর হই গেইল— ‘উমার সাঁথে মুইতো চলি গেইলে পারতুং।’

এহার পাছত সুনীতিদির বা প্রকৃতিদির হামার বাড়িত আসিবার আর প্রশ্ন-এ উঠিল না।

অজিত ছাওয়াটা আছিল খুব সংযত, খুব চাপা। তার মনের ভিতরকার তোলপাড় সে চাপি দিয়া কলেজত তখুন নতুন করি হাড্ডি-বিদ্যার চর্চা হইচে তাতে-এ মন দিলেক। কলেজের প্রায় কাহোঁয়ে-এ তার পারিবারিক দুর্ঘটনার কাথা জানিবার পাইল না। মোকও কই দিলেক, এ নিয়া কারো সাঁথে আলোচনা না করিবার।

অজিতের সাঁথে মোর ক-দিনের-এ বা আলাপ, তার-এ ভিতরত এতগুলা ঘটনা ঘটি যাওয়ায় মোর মনত হইল যেন কত বছরের আলাপ অজিতের সাঁথে। কেমন করি জানং না, এইসবের পাছত অজিতের উপর মোর একটা মস্ত টান পড়ি গেইল। মনত হইল অজিতের নাকান এমন প্রিয় বন্ধু মোর আর নাই। অজিতের সাঁথে তাই প্রাণ ভরি মিশতুং, লেখাপড়াও করতুং প্রায় এক-এ সাঁথে।

দুইজন মিলি হাড্ডি-বিদ্যার চর্চা করতুং এক জাগাত বসি। অজিত মোর মুখস্থ ধরিলেক, মুই ধরতুং অজিতের। হামার লেখাপড়া বেশ ভালো-এ চলিচিল। কত দিনত একখান মড়া পামু যার ছাল, মাংস আর শিরা-উপশিরাগুলাক আলাদা করি ছাড়ি ছাড়ি দেখিম। দেখিম হামার বই-পড়া মুখস্থ বিদ্যার সাঁথে মিলে কি না, এই নিয়া অজিতের সাঁথে প্রায়-এ মোর আলোচনা হইলেক। হামরা মড়া না পায়া সত্যি একটু অসহিষ্ণু হই উঠিচিলাম। অন্য ছাত্রগুলার মড়া কাটা মাঝে মাঝে উঁকি মারি দেখতুং বটে, কিন্তুক তাতে মন উঠিলেক না।

সেই বছরের কোর্স অনুযায়ী হামার কাটিবার কাথা একখান করি হাত। অজিতক তাই মুই কতুং— ‘ওরে একটা পুরা মানষি না পাওয়া যাউক, একখান ছেঁড়া হাতও জোটে না হামার ভাগ্যত?’

অজিত কইল— ‘এত যদি তোর তড়িঘড়ি, কাট তে মোর-এ একখান হাত কাট।’

এইভাব-এ চলিচিল। একদিন দুই ক্লাসের ফাঁকত অজিতের সাঁথে বসি গল্প করেচুং, এমন সমে হঠাৎ একটা ছাওয়া আসি খবর দিয়া গেইল, হামার বাদে একটা মড়া আসিচে। মুই লাফি উঠনু। এতদিন অপেক্ষা করার পাছত এ তো মড়া নোহায়, হাতত যেন চাঁদ পালুং। হামরা দৌড়ি গিয়া হামার মড়াটা দেখি আসনু। ভিজা কাপড়ে ঢাকা শুকনা এক মৃতদেহ ঘরের এক কোণত এক টেবিলত শুয়াই থুইচে। এখুনও অক্ষত, ঘরের অন্যান্য মড়ার নাকান ছিন্নভিন্ন নোহায়। মুই কনু— ‘আজ-এ নাগি যামু। আর ধৈর্য ধরি থাকিবার পারং না, কি কস?’

অজিত মোর নাকান অতটা উৎসাহ দেখাইল না। সেই দিন তার শরীলটা তেমন ভাল আছিল না, আগ থাকি-এ বাড়ি যামু যামু করিচিল। তাক আমতা আমতা করিবার দেখি মুই কনু— ‘অজিত, তুই বরং আজ বাড়ি যা, তোর শরীল খারাপ। ভাল করি ঘুম দে গা। মুই আজ ক্লাসের পাছত মড়াটাক তৈরি করি থুম, একটু-আধটু আঁচড়ও পারি তো দিম। তার পাছত কাইল থাকি দুইজন শকুনির নাকান ঝাঁপি পড়া যাবে লাশটার উপর।’

সেই দিন শেষ ক্লাসের পাছত অজিত বাড়ি চলি গেইল, আর মুই একটু হাত-মুখ ধুই চা খায়া তৈরি হই নিবার নাগনু মড়া-কাটিবার পইলা অভিযানের বাদে।

বেশ পেট ভরি চা বিস্কুট রুটি খালুং, যেন কোনো উৎসবত যাবার ধরিচুং। তার পাছত কাটাকুটির যন্ত্রের বাক্সটা বগলত নিয়া চলনু মড়ার ঘরের দিকত।

বিকাল হই গেইচিল। সন্ধ্যার খুব দেরি নাই। অন্য ছাত্রগুলা দিনের বেলাতে-এ নিজের কাজ সারি নিচিল। মড়ার ঘরত কাহোঁয়ে আছিল না— ঘর খালি। খালি দেখনু হামার মড়ার টেবিলের আগত একজন মহিলা খাড়া হই আছে। পইলাতে মনত হইল হাসপাতালের কোনো নার্স অথবা উঁচু ক্লাসের কোনো ছাত্রী-টাত্রী হবেন। কিন্তুক যেমন করি নিচু হই উনি একমনে মোর মড়াটাক পরীক্ষা করিচিলেন তাতে কেমন যেন একটু আশ্চর্য নাগিল। এমন করি মড়াটার ভিতরত দেখিবার কি আছে? মুই আস্তে আস্তে আগি গেনু। মহিলাটি মোক দেখিবার পান নাই। যখুন খুব আগত আসিচুং তখুন হঠাৎ মোর উপস্থিতি বুঝি একটু চমকি উঠি সরি গেইলেক। মুই দেখনু, উঁয়ার মুখত যেন একটা অসীম ক্লান্তি আর দুঃখের ছায়া। এমন একটা মুখ দেখিম বলি আশা করিচিলুং না— হঠাৎ তাই কিছু কবার পানু না।

মুই কাথা কবার আগত-এ মহিলাটি মুখ খুলিলেক। উনি কইলেক— ‘আপনার-এ লটত বুঝি এই মড়াটা পড়িচে?’

মুই কনু— ‘হ্যাঁ, ক্যানে কন তো?’

উনি কইলেক— ‘আপনাক একটা অনুরোধ করেচুং। এ মড়া আপনি কাটিবেন না। কোটে যেন একটা ভুল হইচে। এইটা বেওয়ারিশ লাশ নোহায়। এই মোর-এ এক আত্মীয়ার দেহ। কী করি এঠে আসিল মুই বুঝিবার পারেচুং না। মুই কর্তৃপক্ষের সাঁথে দেখা করি এই লাশ এঠে থাকি সরি ফেলার ব্যবস্থা করিম। তার আগত আপনাক অনুরোধ, ইহার গাওত হাত দিবেন না।’

এই কয়া-এ মহিলা ব্যস্ত হই দ্রুত পাওত ঘর পার হই দুয়ার দিয়া বাইর হই গেইলেক, বোধায় কর্তৃপক্ষের-এ উদ্দেশে।

যন্ত্রের বাক্স হাতত থুই স্তব্ধ হই মুই খানিকক্ষণ বসি রনু। তার পাছত হতাশ মনত ঘর থাকি আস্তে আস্তে বাইর হই আসনু। বাইর হই-এ দেখুং শীতের আকাশ কালা করি মেঘ জমিচে। একটা ভিজা বাওয়া বহিবার ধরিচে।

পইলাতে-এ চলনু মুই অজিতক খবর দিবার। হাতত লাশ পায়া এমন করি হাতছাড়া হই যাবে— এমন নিরাশ জীবনত মুই কখুনো হই নাই। অজিতের বাড়ি পৌঁছিবার পৌঁছিবার ঝড়ি আসি গেইল। দৌড়ি গিয়া যখুন উমার বাড়ির ভিতরত ঢুকনু, তখুন কাপড় জামা ভিজি গেইচে। অজিতের মা মোক শুকনা কাপড় দিলেক আর কইলেক, অজিত এখুনও বাড়ি ফিরে নাই।

অজিত একটু পাছত-এ ফিরিল ভিজতে ভিজতে। তার এই অদূরদর্শীতার বাদে মোর ঠে বকুনি খাইলেক। অজিতের মা-ও বকিলেক।

অজিত কইল— ‘বাড়ি আসিলে-এ তো বন্দি। তাই আড্ডা-টাড্ডা সারি ফিরনু, এইবার মুড়ি দিয়া শুই পড়িম আর কী!’

বিছনাত ঢলি পড়িতে-এ অজিতের তেড়ে জ্বর আসিল। মুই তাক সংক্ষেপত সেই দিনের ঘটনাটার উল্লেখ করি কনু— ‘আবার কতদিনত একটা বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যায় দেখ।’

অজিত কইল— ‘দুঃখ করিসনে। জ্যান্ত মানষি হাতছাড়া হই যায়, এই তো একটা মড়া।’

অজিতক আর না বকিয়া সেই দিন মুই বাড়ি ফিরি গেনু। মন বড় চঞ্চল হইচিল। মোর ন্যায্য অধিকারত কাহোঁ যেন হাত দিচে, তাই যেমন বিরক্ত বোধ করিচিলুং তেমন আবার সেই মহিলাটির দুঃখ-ক্লান্ত মুখের কাথা মনত করি মায়াও করিচিল। আহা, বেচারার আত্মীয়ার দেহ— তার সদ্গতি না হইলে উনি-এ বা শান্তি পাবেন কোটে থাকি? আচ্ছা, কেমন করি উনি দেহটার সন্ধান পাইলেক? —সেইটায় আশ্চর্য! নিশ্চয় অনেকদিন ধরি ওত পাতি আছিলেক— যেমনি টেবিলত লাশ আসা অমনি আসি ছোঁ মারি পড়িচে। কিন্তুক এই কেশহীন বর্ণহীন শুকনা কঠিন মৃতদেহ, এইক শনাক্ত করিলেক কী করি? বাহাদুরি আছে কবার নাগিবে।

নানা চিন্তাত রাইতক ভাল ঘুম হইল না। সকালে একটু বেলা করি উঠি মুখত ভাত গুঁজি কলেজত গেনু। পইলাতে-এ খোঁজ নিনু, মোর মড়া সরাইচে কি না। কাহোঁ সেই লাশ দাবি করিচে কি না?

আশ্চর্য হই গেনু, যখুন শুননু, কাহোঁয়ে-এ লাশ দাবি করিবার আসে নাই। শুননু, এতদিন পাছত এই লাশ দাবি করিবার কারো-এ নাকি অধিকার নাই। দাবি করিবার সমে বহুদিন হইল পার হই গেইচে। মৃতদেহ এত বিকৃত হই গেইচে যে তাক এখুন শনাক্ত করা অসম্ভব। করিলেও কর্তৃপক্ষ তা মানিবেন না। শুনি মোর খারাপ নাগিল। মহিলার বাদে দুঃখ হইল। মড়াটা শুননু পাওয়া গেইচিল বিহারের কোনো এক অঞ্চলত। পুলিশের ঠে বহুদিন পড়ি থাকিবার পাছত লাশটা বেওয়ারিশ বলি ঘোষণা করি স্থানীয় ডাক্তারি কলেজত দিয়া হয়, কিন্তুক সোটে অতিরিক্ত লাশের প্রয়োজন না থাকায় কলকাতাত চালান দিয়া হইচে।

অন্য ছাত্রগুলা মড়া-কাটা ঘরত গেইল যে-যার মড়ার আগত। পাছে মহিলা আসি পড়ে এই ভাবি মুই গেনু না। কিন্তুক সারাদিন মহিলার কোনো খোঁজ পাওয়া গেইল না। মুই তখুন এই ভাবি নিশ্চিন্ত হইনু যে উনি বোধায় নিরাশ হই উঁয়ার দাবি ত্যাগ করিচে। ক্লাসের শেষত আরও একবার খোঁজ নিনু যে উনি আসিচিল কি না। শুননু, আসে নাই। মড়াটা কাটিবার পারি কি না জিজ্ঞাসা করাতে উত্তর পালুং, আলবাত পারি— ওই দেহের সম্পূর্ণ অধিকার হামার কলেজের মড়া-কাটা ঘরের, আর কারো নোহায়।

এই শুনি মোর আবার মড়া কাটিবার উৎসাহ ফিরি আসিল। গোড়াত ভাবিচিলুং, অজিতের জ্বর সারি গেইলে দুইজন একসাঁথে কাজ আরম্ভ করিম, কিন্তুক হাত নিশপিশ করি উঠিল। মনত হইল, আজ অন্তত দুই-একটা আঁচড় মারি কাজটা আরম্ভ করি যাওয়া যাউক।

এই ভাবি মড়ার ঘরত গিয়া ঢুকনু। সেই দিনও ছাত্রগুলা যে-যার কাজ শেষ করি চলি গেইচিল। ঘর খালি। মড়ার ঘরের ভ্যাপসা গন্ধ নাকত ঢুকিবার সাঁথে-এ দেখনু, কী আশ্চর্য আজও সেই মহিলা মোর মড়ার আগত একটা উঁচু টুলের উপর বসি আছে।

মোক ঘরত ঢুকিবার উনি দেখিচিলেক। মনত হইল মোর-এ বাদে যেন অপেক্ষা করিচিলেক। মুই উঁয়ার আগত যাইতে-এ কইলেক— ‘দেখেন, এই দেহ আপনি কাটিবার পারেন, কিন্তুক অজিত যেন না ছোঁয়।’

মুই অবাক হই কনু— ‘আপনি অজিতক চিনেন নাকি?’

মহিলা টুল ছাড়ি উঠি খাড়া হইলেক। একটু থামি একটা নিশ্বাস নিলেক। তার পাছত কইলেক— ‘এই দেহ অজিতের দিদি প্রকৃতির।’

সে কী!

কিসের যেন একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খালুং। সমস্ত দেহ অসাড় হই গেইল— বসিবার টুলটা শক্ত করি চাপি ধরনু। দেখুং, মহিলা দ্রুত পাওত ঘর ত্যাগ করি চলি যাবার ধরিচে। মুই চেঁচাই কনু— ‘আপনি কায়?

মহিলা এক মুহূর্ত থমকি মোর দিকত ফিরি তাকাই একটু স্নান হাসি হাসিলেক, তার পাছত দ্রুততর গতিত দুয়ার পার হই চলি গেইলেক।

এইবার মুই চিননু। কোনোদিন চাক্ষুষ দেখি নাই, কিন্তুক অজিতের মাক তো দেখিচুং— সেই কপাল, সেই চোখ। অজিতের মীরাটের মাসি, যিনি ট্রেন দুর্ঘটনাত মরি গেইচে— উনি ছাড়া আর কাহোঁ নোহায়।

একা মুই মড়া-কাটা ঘরের ভিতরত। মোর আগত পড়ি আছে যার বিকৃত গলা দেহ, এই কিছুদিন আগত-এ তাক দেখি ভাবিচিলুং, তার নাকান সুন্দরী পৃথিবীত নাই। সেই শীতের সন্ধ্যাত কপালের ঘামটা মুছি যত তাড়াতাড়ি পারি ঘর থাকি বাইর হই আসনু।

কী করা যায় এখুন? যা দেখনু আর শুননু তা কি বিশ্বাস করিম না ভুয়ো বলি উড়ি দিম? ভুয়ো-এ হউক আর সত্যি-এ হউক, অজিতক কিন্তুক ওই মড়া ছুঁইতে দিয়া হইবে না। মুইও যে ছুঁইম না তা-ও একরকম প্রায় ঠিক।

চলনু সোজা অজিতের বাড়ি। অজিতের মার সাঁথে দেখা হইতে-এ উনি কইলেক— ‘অজিতের জ্বরটা আজ বাড়িচে। ঘুমাচে বোধায়। সুনীতি ঘরত আছে, যাও বাবা তুমি দেখি আসো।’

আন্ধারাচ্ছন্ন ঘর। বারান্দা দিয়া পা-টিপি-টিপি ঘরের দিকত আগি গেনু। শীতের আকাশের কালা মেঘে বারান্দাটাও আবছায়া আঁধারে ঢাকা। সোটে খাড়া হই একটু থমকি ঘরের ভিতরত উঁকি মারনু। দেখনু, অজিত ঘুমাচে— বুকের উপর একখান হাত নিশ্বাসের সাঁথে উঠিচে আর নামিচে। কিন্তুক তার মাথার আগত খাড়া হই ওই কায়? সুনীতিদি তো নোহায়— ওই যেন প্রকৃতিদি। স্পষ্ট হুবহু ঠিক আগের দিনের নাকান, অজিতের সেই ছোটদি যে মোক গরম লুচি আর বেগুনভাজা খুয়াইচিল।

মাথাটা কেমন ঘুরি উঠিল। চোখ মুছিতে মুছিতে আন্ধার ঘরের ভিতরত আস্তে আস্তে ঢুকনু। যখুন অজিতের মাথার আগত আসনু তখুন দেখনু সুনীতিদি-এ খাড়া হই নীরবে তাক বাতাস করি চলিচে।

মুই ফিসফিস করি কনু— ‘অজিত এখুন ঘুমাচে, মুই যাং। কাইল আবার আসিম।’

সুনীতিদি কিছু কইলেক না, খালি একটু ঘাড় নাড়িলেক।

.

তার পাছের দিন-এ মুই বাড়িত কনু— ‘মোর দ্বারা মড়া কাটা চলিবে না। মুই ডাক্তারি পড়া ছাড়ি দিম।’

পইলাতে খুব আপত্তি উঠিল, কিন্তুক মুই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সগায় যখুন বুঝিলেক, মোক টলানো যাবে না, তখুন কইলেক— ‘যা খুশি কর।’ মুইও সেই দিন-এ কলেজের প্রিন্সিপ্যালের সাঁথে দেখা করি মোর নাম কাটাই আসনু।

প্রিন্সিপ্যাল একটু অবাক হই কারণ জানিবার চাইলেক। মুই সংক্ষেপত কনু— ‘মোর ভাল নাগিচে না।’ এই নিয়া আর কোনো কাথা হইল না।

অজিতের অসুখ কিন্তুক বাড়ি চলিল। শেষত এমন অবস্থা হইল যে আজ যায় কী কাইল যায়! যাই হোক অজিত কিন্তুক শেষ অবধি টিকি গেইল। বহুদিন ভুগি যখুন সে সারি উঠিল তখুন কলেজের ছুটি নতুন সেশান কিছুদিনের ভিতরত-এ আরম্ভ হইবে। মুই তো কলেজ ছাড়ি-এ দিচুং— অজিতেরও একটা বছর নষ্ট হইল।

অজিতক এতদিন মোর ডাক্তারি কলেজ ছাড়ার কাথা কই নাই। এইবার কনু।

সে শুনি কইল— ‘ক্যানে কী হইচিল?’

মুই সংক্ষেপত কনু— ‘মড়া কাটা মোর দ্বারা হইবে না।’

অজিত অবাক হই কইল— ‘সে কি রে? তোর অত উৎসাহ আছিল। মড়ার বাদে যে শকুনির নাকান বসি আছিলি, মনত নাই?’

বিষয়টা নিয়া আলোচনা করিবার মোর আদৌ ইচ্ছা আছিল না, মুই কনু— ‘যা হবার হই গেইচে। এবারে মুই অন্য কিছু পড়িম।’

অজিত কইল— ‘মুইও তে ডাক্তারি পড়া ছাড়নু।’

মুই কনু— ‘বাঃ তা ক্যানে? মোর-এ না হয় মড়া কাটাক ভয়, তুই ক্যানে ছাড়িবি?’

অনেক বুঝাবার পাছত অজিত শেষত রাজি হইল। কইল— ‘যাউক তে তোর কাথা-এ শুননু। কিন্তুক তুই যে এমন ভীতু তা তো জানতুং না।’

.

সেই আজ বহু বছরের কাথা। তার পাছ থাকি-এ অজিতের সাঁথে মোর ছাড়াছাড়ি। এখুন সে কোটে আছে জানং না। নিশ্চয় কোটো ডাক্তারি করেচে। যে পথত হামরা একসাঁথে চলিবার শুরু করিচিলাম, মনত করিচিলাম, এইভাব-এ চিরদিন চলিম দুই বন্ধুতে, তা যে ক্যানে হঠাৎ দুই-মুখা হই দুই দিকত চলি গেইল তার আসল রহস্যখান এতদিন খালি মোর-এ আগত গোপন আছিল। আজ তা প্রকাশ করিবার যায়া দেখেচুং সমস্ত জিনিসটা গল্পের নাকান শুনাচে। এইতে আজ আর কারো কোনো ক্ষতি হইবে না জানিয়া মোর গোপন ইতিহাসখান লোকচক্ষুর আগত মেলি ধরনু।

[ মৌচাক, আশ্বিন ১৩৬২ (সেপ্টম্বর ১৯৫৫) ]

বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ

Post a Comment

Previous Post Next Post