পারমাদান দেখিয়াই বাড়ি ফিরিবার ইচ্ছা আছিল সুজিতের।** পারমাদান রিজার্ভ ফরেস্ট। শীতের আমোদে রইদত বেশ ভালো-এ নাগচিল ঘুরিতে। নানা নাখানের গাছ। ম্যালা গাছ-এ অজানা। নাম হয়তো শুনিচে। কিন্তুক দেখিবার সুযোগ কখনো হয় নাই। গাছের উপর নাম লেখা আছে বুলিয়া চিনির পাইচিল। এই ছাড়া হরিণও আছে বেশ কয়েকশো। অলপ আগত হরিণগুলাক খাবার খোয়ানো হইচিল। তখনে একসাথে পেরায় সবগুলাক দেখাও গেল।
ঘুরিতে ঘুরিতে হঠাৎ ঘড়ির পাকে চকু পড়িল সুজিতের। চাইরটা বাজে। এইঠে থাকি কলকাতা গাড়িত পেরায় আড়াই ঘণ্টার পথ। এখনে-এ না বাইর হইলে ফিরিতে ম্যালা রাইত হয়া যাইবে। শীতের বেলা। ইয়ার ভিতরেই ঠান্ডা হাওয়াত ভর করিয়া গাছের ছায়াগুলা নম্বা নম্বা হাত বাড়াইচে। কোণঠাসা রইদ গাছের কয়টা পাতার উপর খাড়া হয়া কাঁপির ধরচে। ফিরিবার বাদে গাড়ির পাকে আগাইচে হঠাৎ এখান রোগা-মতন বুড়া মানষি উয়ার পাকে আগেয়া আইল। মানষিটার সাথত আগতও দুইবার চকু-চকুয়ি হইচে, কিন্তুক কোনো কাথা হয় নাই।
— নীল কুঠিত যাইবেন কত্তা?
— সে আবার কোটে?
— এই মিনিট দশেক নাগিবে। আগত-এ ডিঙি আছে। নদী পাড় হয়া উল্টা পাকে।
— আজি থাক। পাছের বার আসিয়া যাইম। এখনে-এ তো সইন্ধ্যা হয়া আইল। গেয়া ফিরি আসিতে আসিতে ম্যালাক্ষণ নাগি যাইবে।
কয়া আবার গাড়ির পাকে আগাইল সুজিত। যাইবার যে একেবারে ইচ্ছা করির ধরচিল না, তা না হয়। নীলকুঠি এখনে আর কয়টাই বা আছে! বেশিরভাগ-এ ভাঙ্গি গেইচে। দুইশো বছর আগের যে কয়টা আছে — তা হাতত গনন যায়। তা ছাড়া ম্যালা প্রজন্ম আগত সুজিতের পরিবার নাকি এইলা পাকে থাকিত। বড় জমিদারি আছিল এই পাকে। তা সে ম্যালাদিনের কাথা।
সুজিতের ইতস্তত ভাবটা বোধহয় টের পাইচিল মানষিটা। কয়া উঠিল — চলেন কত্তা। আসা-যাওয়া আধা ঘণ্টা সময়। এইঠে আসিয়া ওইটা না দেখিলে বড় ফাঁক রয়া যাইবে। কয়দিনের-এ বা জীবন — না দেখিলে পাছত — ওই কী যেন কন — মেস করি যাইবেন!
— ঠিক আছে, চলো। তা তোমার নাও ঠিকঠাক আছে তো? জলত ডুবি-টুবি যাইবে না তো?
— কী যে কন! এইটা নিয়া কোনো চিন্তা করিবেন না। এই তিরিশ বছর ধরি ইছামতীত নাও চালাইচুং। কখনো মানবমাঝির নাওত কিছু হয় নাই।
মানষিটা ঘাটের পাকে আগাইল। সুজিতও উয়ার পাছত নিল। মিনিট দুই হাঁটিয়া ঘাট। ঘাটের আগত-এ মানবমাঝির ডিঙিনাও আছিল। সরু ডিঙি, মাঝত এখান কাঠ ফেলা। উয়ার উপর বসির নাগিবে। সাবধানে উঠিয়া তাত বসি পড়িল সুজিত। ভালো সাঁতার জানে সুজিত। অবশ্য ইছামতীর জলের যা গভীরতা, তাত সাঁতার না জানিলেও ডোবা শক্ত। নদী বাইয়া মানবমাঝি নিপুণ হাতত নাও চালাবার নাগিল। কিছু কিছু জাগাত কচুরিপানাত পেরায় পুরা নদীটাই ঢাকি গেইচে। তবু উয়ার-এ ফাঁক দিয়া দিয়া ডিঙি আগেয়া চলিল।
মানবমাঝি অনর্গল কাথা কয়া যাইচে। উয়ার ছাওয়া দুবাইত কাম করে। সেকারের চওড়া ঝকঝকে রাস্তা — আকাশছোঁয়া বাড়িঘর। তারপাছত দুবাই ছাড়িয়া এইঠেকার গল্প। ট্যুরিস্ট আসে শনি-রবিবার। কিন্তুক সপ্তাহের দিনত পেরায় কায়ো-এ আসে না। অফ সিজনেও মানষিজন পেরায় আসে না, তখনে ও মাঝরাইতত উঠিয়া নদীত মাছ ধরে, সে মাছ বাজারত বেচে, চাষবাস করে সে ফসল বেচিয়া চালায়। সবমিলিয়া বেশ আছে।
— বুঝলেন কর্তা, সবই ভাগ্য। আমরা হইলাম গেয়া জলের পোকা, আর মোর মেয়ের ছোট খোকাটা এই জলত ডুবি মরি গেল গত আশ্বিনে। এই যে দেখেন — আপনি আইলেন — মোর নাও-ত চড়িলেন — না-ও চড়ির পাইলেন হয় — আবার চরণ মিঞার ভাঙা নাওতও চড়ির পাইলেন হয় — সবই ভাগ্য, তাই না?’
এইলা পাগলের প্রলাপ শুনিতে শুনিতে সুজিত আশপাশের পাকে তাকাইচিল। পাশের বনত হরিণের দেখা না পাইলেও বেশ কয়টা মাছরাঙা-ফিঙে-সারস-বকের দেখা মিলিল। আরও বেশ কয়টা নাম না জানা পাখি।
মিনিট দশেক পাছত উল্টা পাকের এখান ভাঙা ঘাটত ডিঙি ভিড়েয়া মানবমাঝি কয়া উঠিল — উঠি যান কত্তা। ওই বনের মাঝ বরাবর রাস্তা আছে।
— কোটে? তেমন কোন রাস্তা তো দেখির পাইচুং না!
— এ কি কত্তা আপনার কলকাতার চওড়া রাস্তা পাইচেন! তাও যা আছিল গাছ-আগাছাত বুজি গেইচে, আসলে এই কুঠির অলপ দুর্নাম আছে তো। তাই মানষি আজিকাল আসির ভরসা পায় না। অলপ আগাইলেই আপনি টের পাইবেন।
সুজিত এমনিতে যথেষ্টই ডাকাবুকো। তবু এই কাথা শুনিয়া-এ কইল — আগত কন নাই তো! তা কীসের উৎপাত — চোর, ডাকাত না ভূতের?
— কর্তা, মানষি তো কত কী-এ কয়! মোকেও তো পাগল কয়! এইঠে ভূতের উৎপাত আছে কয়া। তা ভূত চেনা হইল ভাগ্যির ব্যাপার। কায় যে আসল ভূত, আর কায় যে নকল ভূত — তা বুঝা-এ যায় না। কয়জনের আর ভূত দেখিবার সৌভাগ্য হয় কন! যান, যান — আগেয়া যান। যাইবেন আর চলি আসিবেন।
সুজিত আর খাড়া হইল না। চড়াই পথ বাইয়া ঝোপঝাড় সরেয়া সরেয়া উপরের পাকে অলপ উঠিতে-এ গাছের ফাঁক থাকি দূরত এখান বড় বাড়ি উঁকি দিল। বাড়ির আগত বড় এখান চাতাল। চাতালটা পাড় হয়া কাছত যাইতে-এ বাড়ির বুড়া হওয়ার চেহারাটা ধরা পড়িল।
মানবমাঝি যেই নাখান কইচিল, জাগাটা সেই নাখান কিছু নির্জন না হয়। এখান ছাগলছানা ঘুরি বেড়াইচে। মাওয়ের খোঁজত মাঝে মইধ্যে উদ্বিগ্ন হয়া চেঁচাইচে। দুইটা নেড়ি কুকুর চকু বুজিয়া শুতি আছে — আর সব থাকি বড় ব্যাপার হইল এখান মানষি বাড়ীটার থাকি অলপ দূরত চাতালের উপর বসিয়া চপ বেচির ধরচে। ক্রেতা অবশ্য নাই।
সুজিতক দেখিয়া-এ মানষিটা কয়া উঠিল — কী চপ খাইবেন কত্তা? আলু-বেগুন-লঙ্কার চপ? পেঁয়াজি?
তেলটা ক্যাংকরিয়া হবে কায় জানে? তবু অলপ রিস্ক-এ নিল সুজিত। — দুইটা আলুর চপ দেন।
ভালো-এ করিচে আলুর চপ। বেশ খাইতে। পয়লা টা শেষ করি সবে মুখত দ্বিতীয়টা পুরিচে হঠাৎ মানষিটা কয়া উঠিল — ভাগ্যত বিশ্বাস করেন কত্তা?
— না, তা হঠাৎ করি?
— এই যে আপনি আলুর চপ খাইলেন। আপনি না-ও খাবার পাইলেন হয়। খাইলেও বেগুনি খাবার পাইলেন হয় — পেঁয়াজি খাবার পাইলেন হয়। কিন্তুক আলুর চপ-এ খাইলেন। মুই না থাকিলে কিছুই খাইলেন না হয়। তাই না?
অলপ অবাক হয়া সুজিত কয়া উঠিল — ক্যানে? আলুর চপত কিছু আছিল নাকি?
— আরে না, না। আলু আর বেসন। আর লঙ্কা — অলপ পেঁয়াজ।
— তা তুই অমন করি কইলু! মনে হইল…
সুজিত অলপ বিরক্ত হয়া-এ দ্বিতীয় চপটা তাড়াতাড়ি শেষ করি বাড়িটার পাকে আগাইল।
সরু সরু নাল ইটের বানানো বাড়ি। ঘরগুলার আগ দিয়া টানা নম্বা বারান্দা। বেশ কিছু জাগাত উপরের ছাদ থাকি বড় বড় চাঙড় খসি পড়িচে। কিছু ঘরের দেওয়াল আধভাঙা। থামগুলার কিছু কিছু অংশ বেশ বিপজ্জনক ভাবে ভাঙি পড়িচে। কী করি যে বাড়িটা খাড়া হয়া আছে সেটাই রহস্য। সরকার যদি এইলা অলপ সংস্কার করি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করিল হয়। কত মানষির মৃত্যুর কারণ যে এই নীলকুঠি! বাড়িটার ভিতর হাঁটিতে হাঁটিতে এইলা ভাবিতে ভাবিতে শিহরিত হইচিল সুজিত।
— আপনি কি মানিক রায়চৌধুরীর কায়ো হন? হঠাৎ প্রশ্নটা শুনিয়া চমকি উঠিল সুজিত। মুখ ঘুরেয়া দেখিল এখান কালা মোটা মানষি উয়ার পাকে তাকেয়া আছে। চওড়া মুখের অনুপাতত চকুদুইটা ভারী ছোট — কুতকুতে। মোটা গোঁফ। মোটা নাক। ঠোঁট আর নাকের ফাঁক যৎসামান্য। লুঙ্গির উপর ছিটের শার্ট। এখুনও দিনের আলো আছে বুলিয়া বাঁচোয়া। সইন্ধ্যার পাছত মুখোমুখি হইলে সুজিত ঘাবড়ি যাইল হয়।
মানষিটা ফির কয়া উঠিল — আপনি কি মানিক রায়চৌধুরীর কায়ো হন?
— ক্যানে?
— হুবহু উয়ার-এ মুখ বসানো। উয়ার-এ নাখান সিড়িঙ্গে নাক। গোল গোল চকু। কুকুরের নাখান কান।
বেশ বিরক্ত হইল সুজিত। সবগুলা বাজে উদাহরণ। উয়াক মোটেও তেমন খারাপ দেখিতে না হয়। তবু কয়া উঠিল — কায় মানিক রায়চৌধুরী?
— আরে তা জানেন না? মানিক রায়চৌধুরী হইলেন এইঠেকার জমিদার। এইঠে যত রায়ত চাষি আছে — সবাই উনার কাথা শুনিয়া চলে। উনি হইলেন উমার বাপ-মাও।
— আশ্চর্য, কখনো তো উনার নাম শুনি নাই। আর আজিকাল তো জমিদারি বলি কিছু হয় না।
— হা: হা: হা: — কয়া মানষিটা অট্টহাসি করি উঠিল — আপনার পড়াশোনা কদ্দূর? ম্যাট্রিক পাস?
ভারী আস্পর্দা তো মানষিটার! সুজিত রাগি কয়া উঠিল — ইঞ্জিনিয়ার। মানষিটা কী বুঝিল কায় জানে — বেশ বিজ্ঞের নাখান কয়া উঠিল — এই-বাড়িটা কীসের জানেন?
— নীলকুঠি।
— হ্যাঁ, ড্যানিয়েল সাহেবের কুঠি এইটা। ড্যানিয়েল হইলেন নীলকর সাহেব। কী চেহারা মশাই! মোর থাকিও নম্বা চওড়া। হাতের গুলিগুলা কী! চাবুক নিয়া খাড়া হইলে মোরও ভয় নাগি যায়। আর তেমন গলার আওয়াজ।
— তা আপনার সাথত ড্যানিয়েলের নিশ্চয়ই খুব আলাপ!
— অলপ ইয়ার্কি করিয়া-এ কয়া উঠিল সুজিত। দেশ-গাঁয়ত কত নাখানের যে মানষি আজিও আছে!
— না, সেরকম আর হইল কোটে? সাহেবসুবো মানষি। ওই এখদিনের-এ দেখা। সবই ভাগ্য বুঝলেন!
‘ভাগ্য’ — কাথাটা শেষ কয়েক ঘণ্টাত সুজিত বেশ কয়বার শুনিচে। এইঠেকার সব মানষি দার্শনিক নাকি!
— কীসের আবার ভাগ্য! — বিরক্ত হয়া সুজিত কয়া ওঠে।
— হ: — মানষিটা ছিটের জামাটা ঝাড়িতে ঝাড়িতে কয়া ওঠে — দেখিলেই বুঝিবেন। এই যে আপনি এই-বাড়িত আইলেন। আজিকা-এ আইলেন। তারপাছত আবার মানিকবাবুর নাখান মুখ চকু — ভাঙা বেড়ার নাখান দাঁত। না, সবই ভাগ্য।
মানষিটা যে অলপ ছিটেল, তাত সন্দেহ নাই। তবু শীতের এই পড়ন্ত বিকালত এই বাড়িত এখজন সঙ্গী থাকিলে নেহাত খারাপ হয় না।
— তা, কী হইচিল নীল সাহেবের?
— শুনিচিনুং উনাক আগুনত পুড়িয়া মারা হইচিল। এমন অত্যাচার করিতেন যে চাষিরা মিলিয়া নীলকুঠিত আগুন নাগেয়া দিচিল। আর তাত-এ নীলসাহেব অক্কা পান। তবে সে তো পয়লা বারের কাথা। তারপাছত তো কত বছর গেইচে। শেষত কী হইচে কায় জানে! হাসি উঠিল সুজিত — তা কয়া তো আর মৃত্যুর কারণটা বদলি যাইবে না।
— আজিকার দিনটা মনে আছে? বাইশে ডিসেম্বর — গলা খাঁকরি অলপ আস্তে আস্তে মানষিটা কয়া উঠিল — আজিকার দিনে নীল সাহেব মরি যান। সালটা কত আছিল জানি না, তবে পত্যেক বছর ঠিক এই দিনে উনি আবার ফিরি আসেন। থাকেন, দেখিতে-এ পাইবেন।
— কী অ্যাবসার্ড। — হাসি উঠিল সুজিত। মানে পত্যেক বছর আজিকার রাইতত ড্যানিয়েল ফিরি আসেন! খুব পছন্দের জাগা আছিল বুঝি? আর তাই দেখিতে আমরা সব আসি! আর ওই দিনের নাখান-এ নীলচাষিরা আসিয়া বাড়িত আগুন দিয়া দেয়, তাই তো?
— তাইলে তো হয়া-এ আছিল। পত্যেক বছর এইঠে উনি আসেন বটে। তবে, পত্যেক বছর… না, সেসব কাথা যাউক, কাম আছে, আগাও। আপনার নাখান তো আর ট্যুরিস্ট না হই। কইতে কইতে মানষিটা ঘরের ভাঙা দেওয়ালটার পাকে আগেয়া গেল। আর ফাঁক দিয়া পাশের ঘরত গেয়া ঢুকিল।
— শুনির ধরচেন! — সুজিত সাড়া না পেয়া আগেয়া যায় — শুনির ধরচেন? মানষিটা যেন হঠাৎ করি ভ্যানিশ হয়া গেইচে। সুজিত পাশের ঘরত সবে ঢুকিচে, হঠাৎ এখান প্রচণ্ড আওয়াজ — আর একইসাথে প্রচণ্ড জোরে কায়ো যেন সুজিতের মাথাত বাড়ি মারিল। জ্ঞান হারাবার আগের মুহূর্তত সুজিত বুঝির পাইল ঘরের সিলিং থাকি এখান বড় চাঙড় ভাঙি পড়িচে।
জ্ঞান ফিরিতে সুজিত এখান জিনিস খেয়াল করিল। মাথার উপরের ছাদের ম্যালা অংশ ভাঙি চাইরোপাকে ছড়েয়া পড়িচে। যে ফাঁক দিয়া দোতলার ছাদের কড়ি বরগা দেখা যাইচে। ঘরটার ভাঙা দেওয়ালের ফাঁক দিয়া সামান্য আলো আসির ধরচে। মাথাত হাত বোলাইল সুজিত। এখুনও রক্ত চুঁয়েয়া পড়ির ধরচে। তবে চাঙড়ের মূল বড় অংশটা হাতখানেক দূরত পড়ি আছে। ওইটা মাথাত পড়িলে আর দেখির নাগিত না হয়। নির্ঘাত উয়ার-এ এখান ছোট টুকরা মাথাত পড়িচে। তাড়াতাড়ি বাইরত যাবার নাগিবে।
কোনোমতে উঠিয়া খাড়া হইল সুজিত। দেওয়ালত ভর দিয়া আস্তে আস্তে বাইরত বাইর হয়া আইল। রাইত ম্যালা হইচে। কতক্ষণ অজ্ঞান আছিল কায় জানে! কাইল পূর্ণিমা। চান্দের বদান্যতাত চাইরোপাক মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাইচে। বেশ হাওয়া। দূরের গাছগুলা হাওয়াত কাঁপি কাঁপি উঠির ধরচে।
হঠাৎ সুজিতের মনে হইল ও এখলা নাই। কাহার যেন অস্পষ্ট কাথা শুনা যাইচে। কাছাকাছি বাড়িঘর আছে হয়তো। কিন্তুক না, সেরকম আওয়াজও না হয়। কায়ো যেন কানের পাশে-এ কাথা কইচে — অথচ ভালো করি শুনা যাইচে না। কাথাগুলা হারেয়া যাইচে। আর ওইগুলা কী? আগের চাতাল জুড়িয়া বেশ কয়টা ছায়া ছায়া অবয়ব দেখা যাইচে। মাঝে মইধ্যে কাঁপি উঠিয়া সরি যাইচে। বারান্দাত জোছনার আলো। কিন্তুক ছায়াগুলা কাহার? সেরকম কিছু তো আশপাশত নাই — যার ছায়া ওই নাখান নড়িবে।
না, এইটা হইতে পারে না। মাথার চোটের বাদে-এ নিশ্চয়ই ভুল দেখির ধরচে — মনক বুঝাইল সুজিত। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এইঠে থাকি বাইর হয়া ভালো কোনো ডাক্তারের কাছত যাবার নাগিবে। কিন্তুক এত রাইত! এইপাকে জনবসতি না থাকিলে নদী পাড় হবার নাগিবে। মানবমাঝি নিশ্চয়ই অপেক্ষা করি বসি নাই কিন্তুক কাকো জানাইচে কি? আর এই যে এতক্ষণ অজ্ঞান হয়া পড়ি আছিল — কায়ো কি দেখে নাই? এই নাখান বিপদত সুজিত আগত কখনো পড়ে নাই। মাথার ভিতর সব কিছু ক্যাংকরিয়া যেন তালগোল পাকেয়া যাইচে।
হঠাৎ দুইটা ছায়ামূর্তি উয়ার পাকে আগেয়া আইল। দুই হাত ধরিয়া যেন কায়ো হঠাৎ টান দিল। আটকাবার ক্ষমতা আছিল না সুজিতের। সামান্য চেষ্টা করি বুঝিল যে যারা টানির ধরচে, উমার গায়ের জোর বহুগুণ বেশি। সিঁড়ি দিয়া উয়াক হেঁচড়াইতে-হেঁচড়াইতে উপরত টানি নিয়া যাইচে। দোতলার নম্বা বারান্দা। মেজের উপর দিয়া টানিতে টানিতে সুজিতক উমরা নিয়া চলিল। তারপাছত বারান্দার মাঝামাঝি আসিয়া উয়ার হাতটা ছাড়ি দিল। ছিটকি গেয়া মেজেত বসি পড়িল সুজিত।
টুকরা টুকরা চান্দের আলো বারান্দাত ছড়েয়া। পাশের কাঁঠাল গাছটার পাতার ফাঁক দিয়া আসিয়া পড়িচে। তবু এই ছায়াময় বারান্দাত স্পষ্ট ও টের পাইল আরেকটা দীর্ঘ ছায়া উয়ার পাকে আগেয়া আসির ধরচে। আর আশপাশ থাকি অস্পষ্ট কিছু কণ্ঠস্বর — নালায়েক, দেওয়ান… মানিক…
হঠাৎ বুকের উপর এখান ভারী বুটের আঘাত। আর্তনাদ করি উঠিল সুজিত। যেন দমবন্ধ হয়া গেল অলপক্ষণ। কোনোমতে সামলি নিয়া উঠি বসিবার যাইবে। হঠাৎ এখান চাবুকের আঘাত, উয়ার হাতের উপর। চামড়া কাটিয়া যেন বসি গেল। কিছু বুঝি ওঠিবার আগত-এ আবার চাবুক আছড়ি পড়িল। সুজিতের চিৎকারত চাইরোপাকের নিস্তব্ধতা কাটি গেইচে। উয়ার-এ মাঝত আরও কার যেন উত্তেজিত কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শুনা যাইচে। কয়টা কাথার পাছত হারেয়া যাইচে, আবার শুরু হইচে। যেন টুকরা টুকরা শব্দ নিয়া বাতাস খেলা করির ধরচে।
সাহেবি ভারী গলাত কায়ো যেন কয়া যাইচে — আমার দাদন, সব মিছে, পাজি-নেমকহারাম-বেইমান! মোর নামে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছত নালিশ! রাসকেল — আজিকার ভিতর তুই ষাট বিঘা দাদন লিখিয়া দিবি — নচেৎ এই শ্যামচাঁদ তোর মাথাত ভাঙিম। গোস্তাকি! তোর দাদনের বাদে দশখান গ্রামের দাদন বন্ধ রইচে। দস্তুর মোতাবেক না দিলে তোর চামড়া খুলি নিম।
পাশ থাকি আরেকজনের গলা শুনা গেল — হুজুর, সব রায়তক মানিকবাবু খেপাইচে, উমরা কায়ো নীলের দাদন নিচে না।
আবার সাহেবের গর্জন শুনা গেল।
হঠাৎ কাথাগুলা থামি গেল। মনে হইল ছায়ামূর্তির উল্টা পাক থাকি আরেকটা ছায়ামূর্তি আগেয়া আসির ধরচে। ভারী চটির আওয়াজ। কাঁপা গলাত সাহেব যেন কয়া উঠিল — দেওয়ান, এই ব্যাটা তাইলে কায়?
গম্ভীর গলা উল্টা পাক থাকি ভাসি আইল — মুই মানিক সাহেব। তুই ভুল মানষিক মানিক ভাবিচিস। ম্যালা সহিচুং, আর না হয়। অন্য ছায়ামূর্তির হাতত ধরা এখান বন্দুক গর্জি উঠিল। সাহেবের ছায়ামূর্তি মাটিত বসি পড়িচে। আবার দুই-দুইটা বন্দুকের গুলির আওয়াজ। সাহেব মাটিত শুতি পড়িল। স্বপ্ন যে দেখির ধরচে না সুজিত পাশের গাছের এখান পাখির ডানা ঝাপটানো তা প্রমাণ করি দিল।
আগত-এ দুই-ফুট দূরত সাহেবের ছায়ামূর্তি পড়ি আছে। চাবুকাঘাত বন্ধ হইচে, ভারী চটির শব্দ কাছত আগেয়া আসির ধরচে। কিন্তুক উঠি খাড়া হবার ক্ষমতা নাই সুজিতের। চকুর আগত হঠাৎ-এ সব ফির আন্ধার। জ্ঞান হারাইল সুজিত।
— ক্যাংকরিয়া আছেন কত্তা?
ঘোলাটে দৃষ্টিটা স্পষ্ট হইতে সুজিত লক্ষ্য করিল যে ও এখান সাধারণ হাসপাতালের বেডত শুতি আছে। পাশত এখান টুলের উপর মানবমাঝি। পিন্ধনে লুঙ্গি-হাফশার্ট। উয়ার নিজের হাত-পাও-মাথাত-ব্যান্ডেজ। স্যালাইন চলির ধরচে।
মানবমাঝি কইতে থাকে — কী কইচিনুং কত্তা! সবই ভাগ্য! তা না হইলে আপনার মাথাত-এ চাঙড় ভাঙি পড়ে আর নীলকর সাহেবও আপনাক দেখিয়া মানিকবাবু কয়া অমন ভুল করে! তবে ভুল হবার-এ কাথা। মোর খেয়াল হয় নাই আগত। খালি ভাবিচিনুং আপনাক অমন চেনা চেনা নাগে ক্যানে! ওই নীলকুঠিত এখান ছবি আছিল — ঠিক উয়ার-এ নাখান আপনার মুখটা। তা কত্তা, এইলা কাথা পাঁচকান করিবেন না। এই মুই দুই-এখান কাথা কং বুলিয়া সবাই মোক পাগল কয়। আপনে-এ কন, মুই কি পাগল?
অলপ থামিয়া আশপাশত দেখিয়া নিয়া মানবমাঝি মুখটা সুজিতের কানের কাছত নিয়া আসিয়া কয়া উঠিল — তা শুনলাম সবাই এইবার ভারী খুশি। আপনার বাদে-এ এখবছরের বাদে নালমুখো বদ সাহেবটাক জব্দ করা গেইচে। নীলচাষ সব বন্ধ হয়া গেইচে। মানিকবাবু নাকি আপনার দেখা পাবার বাদে বাচ্চার নাখান ছটফট করির ধরচে। যাউকগে, সে না হয় আপনার হাত-পাগুলা অলপ জোড়া নাগি গেলে মুই-এ নিয়া যাইমখন, মোর নাও ছাড়া ওইঠে যাবার তো জো নাই। ভাগ্য কত্তা — সব ভাগ্য!
---
বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ
হালিচা:
ভুতের গপ্পো