‘এটাক চিনির পাছিস?’
একনা ঝিমনি ভাব আসিছিলো অম্লানোর। হঠাৎ পুছ শুনি ঝিমনিটা কাটি গেইল। হাত দেড়েক দূরতেই একটা মানষি খাড়া হইছে। দাড়ি-গোঁফ নাই মুখখান। কাটা কাটা নাক-চোখ। অম্লানোক চুপ করি থাকিবা দেখি মানষিটা কহিল, ‘গাওখান কেমন লাগেছে?’
‘ঠিক আছে।’ অম্লান চাইরোপাকে একবার চাহি নিল। ওই শুতি আছে একটা খাটের উপরত। খাটের চাইরোপাক কাচ দিয়া ঘেরা। ঘরখান বেশ বড়, গোল মতন। কনকনা জার। ঘরটাত তিনটা মানষি। যিটা পুছ করেছে তার গাত গাড় নীল রঙের কাপড়। কাপড়খান এত জলজল করে যে চোখত লাগে। আগত কুনোদিন দেখিছে বলি মনে না হয়। আর দুইজন একনা দূরত খাড়া হইয়া নিজের মইধ্যে আস্তে আস্তে কথা কইছে।
‘মোর – মোর কী হইছে?’
মানষিগিলা চুপ করি থাকে। উমার চোখের চাহনি, মুখের ভাবত এতখান কাঠিন যে দুসরা বার পুছ করিবা দ্বিধা করে অম্লান। মাথা উঁচা করি নিজের গাওখান দেখিবার চেষ্টা করে, কিন্তুক পারে না। গলা থাকি ঠ্যাং তক ধলা কাপড়ে ঢাকা। পুরা গাও অবশ। ঠ্যাংখান একনা নড়াইবার চেষ্টা করে। কিন্তুক ঠ্যাংত যেন কোনো সাড় নাই। একটা অচানক ডর উয়াক গিলি খায়। উয়ার কি তাইলে সিরিয়াস কিছু হইছে? প্যারালাইসিস? বাড়ির সগায় কোটে? মিনু, বুবলু উমরা কি জানে? এইগিলা বা কায়? উয়াক কি কিডন্যাপ করা হইছে?
‘কী, এইটাক চিনবার পাইছো?’ মানষিটা আবার পুছ করে গম্ভীর গলায়।
অম্লান চুপ করি থাকে। জিবখানও অসাড় লাগে।
পাছের মানষি দুইটা সামনের মানষিটার কাছত আগি আসে। ফিসফিস করি নিজের মইধ্যে কী একটা আলোচনা করে। সামনের মানষিটা খানিক বাদে অম্লানোক কয়, ‘ঠিক আছে। একনা সময় নেও। আমরা পাঁচ মিনিট বাদে আসিম।’
মানষিগিলাক বাইর হইয়া যাবার দেখি অম্লান ক্ষীণ গলায় কই উঠে, ‘আচ্ছা, একনা কইবেন মোর কী হইছে? মুই ইয়াত আসিনু কেমন করি?’
যিটা পুছ করিছিলো, ওই হাত তুলি একনা ধৈর্য ধরিবার ইশারা করে। তারপর ঘর থাকি বাইর হইয়া যায়। তাও ভাল। একনা একলায় থাকিবার সুযোগ, একনা চিন্তা করিবার সুযোগ পাওয়া গেইল। শুতি শুতি মাথা ঘুরি যতখানি দেখা যায়, ঘরখান দেখিবার চেষ্টা করিল অম্লান। অচানক ঘরখান। কিছুই নাই ঘরটাত। একদম ফাঁকা। এমনকি এয়ারকন্ডিশনারেরও কোনো আউটলেট পর্যন্ত দেখিবা পাইল না। ঘরত যথেষ্ট জোর আলো, তাও কোটে থাকি যে আলো আসেছে তা দেখিবা পাইল না। দেয়ালগিলার রং আস্তে আস্তে বদলাছে। হলদা থাকি ধলা, তারপর কমলা, ফির ধলা। শেষ কী হইছিলো মাথা ঠান্ডা করি তা ভাবিবার চেষ্টা করে অম্লান। মন্টে কার্লো – মানে, যোটে ফর্মুলা ওয়ান কার রেসিং হয়। সেই মন্টে কার্লো থাকিই ফিরিছিলো অম্লান। স্পষ্ট মনে পড়ে। মন্টে কার্লোর বিখ্যাত ক্যাসিনো ‘লে ক্যাসিনো ডে মন্টে কার্লো’ত বেশ খানিকক্ষণ কাটাইছিলো। সামান্য টাকা বাজি করি পনেরো ইউরো মতন লাভই করিছিলো। তারপর বাসত করি লার্গেটো বিচ। বিচটা ছোট, পাথুরা। বিচ থাকি নানান রকম নুড়ি কুড়াইছিলো বুবলুর বাদে, সেটাও মনে পড়িল। ওটে থাকি বাসত চড়ি, সরু গলি দিয়া সামান্য হাঁটি রাজার বাড়ি। ওটে ক্যাফেত চিকেন পানিনি আর ক্যাপুচিনো খাইয়া ফির সাগরের ধার। ইয়াত বেশ খানিকক্ষণ কাটাইছিলো। সাগরের ইয়াকনাত বিচ নাই। খালি সারি সারি ইয়ট থোয়া। বহুত দামী দামী প্রাইভেট ইয়ট। মন্টে কার্লো বড়লোকের জাগা। এই নাও নিয়াই উমরা বাইর হইয়া পড়ে মাঝেমইধ্যে ভূমধ্যসাগরত। আরও খানিকক্ষণ এমন করি সাগরের ধারত কাটি ওটে থাকি হাঁটি মন্টে কার্লো স্টেশন। ওটে কোনো টিকিট কাউন্টার দেখিবা না পাইয়া একজনোক পুছিছিলো। ওই মানষিটা ছিল ফ্রেঞ্চ। বিন্দুমাত্র ইংরেজি বুঝে না। তাও খুব হেল্পফুল। একটা মেশিনের সামনত অম্লানোক নিয়া গেইয়া দেখি দিছিলো কেমন করি টিকিট কাটিবা হয়। কোটে যাইবে, কখন যাইবে, কী ক্লাসত যাইবে – ফার্স্ট ক্লাসত না সেকেন্ড ক্লাসত – এইগিলা সিলেকশন পরপর করি নিজে নিজেই টিকিট কাটা যায় ইয়াত। এমনে করিই মন্টে কার্লো থাকি ভেন্টিমিগলিয়ার টিকিট কাটিছিলো অম্লান। ভেন্টিমিগলিয়া হইল ইটালি আর ফ্রান্সের বর্ডার।
অম্লানোক যাবার নাগিছিলো ইটালির জেনেভাত। তাই ট্রেন চেঞ্জ করি আবার ভেন্টিমিগলিয়া থাকি জেনেভার ট্রেন ধরিবা নাগিত।
এতখান পর্যন্ত ভাবি চিন্তাত বাধা আসিল। দুয়ার ফির খুলেছে। মানষিগিলা ঘরত ঢুকেছে। নীল জামার হাতত সেই ছবি। পাছত বাকি দুইজন।
‘এইটাক চিনবার পাইছো?’ – ফির একই পুছ। ছবিখান এবার অম্লানের মুখের সামনত তুলি ধরে মানষিটা। কেয়ারফুলি লক্ষ করে অম্লান। দেখিছে বলি তো মনে না হয়। লম্বা মতন মুখ। মোটা ভুরু। ফর্সার দিক রং। মাথার চুল ছোট করি ছাঁটা। চোখ ছোট। হিংস্র চাহনি। কানের পাশত লম্বা জুলপি। দুই গালত অজস্র দাগ। মুখখান দেখিলেই মনে হয় অন্যপাকে চাই।
‘ভাল করি দেখো!’ – মানষিটা শাসানির সুরত কই উঠে।
‘নাহ্, দেখি নাই।’
‘শিয়োর?’
‘হ্যাঁ, শিয়োর।’
শিয়োর কইল বটে, তাও মানষির মুখ খুব একটা মনে থাকে না অম্লানোর। প্রায়ই হয়, যখন কেও আসি কয়, কেমন আছো অম্লানদা? কবে ফিরিলা? – অম্লান দিব্যি কথা চালি যায়। শেষত দেখা যায় যে উয়ার সাথত যে আলাপ করেছে ওই অম্লানোর নাড়িনক্ষত্র জানে, তাও অম্লান কিছুই মনে করিবা পারে না।
‘এইটা কায়?’
মানষিটার হাতত একই ডিজিটাল ফ্রেমত আরেকজনের ছবি! দেখি আফ্রিকান মনে হয়, রং যদিও ফর্সার দিক। চুলখান খোঁচা খোঁচা করি কাটা। এক চিলতে দাড়ি। মোটা নাক। কুতকুতা চোখ।
‘হ্যাঁ, এইটাক চিনি।’
‘কোটে দেখিছো?’
‘ট্রেনত। আমরা একই কেবিনত বসিছিলাম। এর সাথত আরও দুইজন ছিল।’
‘এইগিলা?’
মানষিটা চট করি পরের ছবিত চলি যায়। একটা বেটিছাওয়া। সোনালি চুল। কাটা কাটা নাক-চোখ। চোখের মণি বাদামি। পাতলা গোলাপি ঠোঁট। বেশ ভাল দেখিবার। এর রং বেশ ফর্সা।
হ্যাঁ, এইটাও ছিল একই কামরাত। পরনে ছিল জিন্স প্যান্ট, কালা টি-শার্ট, লেদারের জ্যাকেট। হিলওয়ালা লেদারের গামবুট ছিল ঠ্যাংত। আরেকটা ছাওয়া ছিল উমার সাথত। ছোটখাটো চেহারার।’
‘এইটা কি?’ মানষিটা আরেকটা ছবি দেখায়।
‘না, এইটা নাহয়।’
‘এইটা?’ পরের ছবিত চলি যায় মানষিটা। ফর্সা মতন মুখ। চওড়া কপাল। ঠোঁটের পাশত কালা আঁচিল। ঘাড় তক লম্বা চুল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইটাই ছিল।’
‘তা তোমরা যাইছিলা কোটে?’
‘মুই যাইছিনু ভেন্টিমিগলিয়া থাকি জেনেভা-ব্রিগনোলে। এরা ভেন্টিমিগলিয়াত একসাথত উঠিছিলো। তাও কোটে যাইছিলো তা কইবার পারিম না। ট্রেন তো মিলান তক যাইছিলো। তা জেনেভা তক…’
কইতে যাইয়াও অম্লান থামি যায়। আর যে কিছুই মনে পড়েছে না। জেনেভাত ওই নিজেই কি নামিছিলো? লেভান্টে, স্যাডোনা, এই স্টেশনগিলা পার হইয়া গেইছিলো মনে আছে। ইটালির রিভিয়েরা এলাকা। রেললাইনের একপাকে সাগর, অন্যপাকে পাহাড়। সাগরের পাশ দিয়া ট্রেন চলিছিলো টানেলের মইধ্যে দিয়া লুকোচুরি খেলিতে খেলিতে। সাগরের ধারের আলোর সারি মাঝেমইধ্যে টানেলের আন্ধারত ঢাকি যাইছিলো। আন্ধারত বাইরের প্ল্যাটফর্মগিলা ভাল করি দেখা যাইছিলো না। তাও এই স্টেশনগিলা চোখত পড়িছিলো। অ্যানাউন্সমেন্টও হইছিলো। উমরা কেবিনের আলোটাও নিভি দিছিলো। সেলফোনত একটা অন্য ধরনের গান চলিছিলো। আফ্রিকার মনে হয়। কিন্তুক তারপর? অ্যাবসলিউটলি ব্ল্যাঙ্ক!
‘উমরা কী ভাষাত কথা কইছিলো?’
‘ইটালিয়ান নাহয়। বোধহয় আফ্রিকার কোনো ভাষাত। মরোক্কান কি অ্যারাবিক হইবে হয়তো।’
‘কেনে মরোক্কান ভাষা তুমি জানো বুঝি?’
‘না, মরোক্কান ভাষা জানি না। তাও ইটালিয়ান ভাষা খানিকটা জানি। অন্তত এতখান কইবার পারি যে, উমরা ইটালিয়ান ভাষাত কথা কইছিলো না। অ্যারাবিক ভাষা বলিয়াই মনে হইল।’
‘তা ইটালিয়ান ভাষা জানিলা কেমন করি?’
‘মুই গত দেড় মাস তো ইটালিতেই ছিলাম। তাই অন্তত বেসিক কয়েকটা কথা শিখি গেছি। ‘চাও’, ‘পরন্তো’, ‘বেনে’, ‘অ্যারেবিদার্চি, বোঞ্জোরনো’ – এইগিলা কথা ঘুরি ফিরি উমরা কয়। এমন কোনো শব্দ উমরা সেদিন ব্যবহার করে নাই।’
‘ইটালিয়ান নাহয় তা বুঝিনু, কিন্তুক উমরা যে মরোক্কান তা বুঝিলা কেমন করি?’
অম্লান বুঝিবা পারিল যে পুলিশি জেরা চলেছে। পত্তেকটা কথা খেয়াল করি কইবার নাগিবে। মরোক্কান কওয়াটা ভুল হইছে। উমাক মরোক্কান ভাবিবার কোনো কারণই নাই। নেহাতই ওই শুনিছিলো যে, আফ্রিকার মরোক্কো এলাকার মানষিগিলা ফর্সা হয়। আর এতখানও জানে যে, ইটালির এই এলাকাত বহুত মরোক্কান থাকে।
অম্লানোক চুপ করি থাকিবা দেখি মানষিটা আবার পুছ করে উঠে, ‘তুমি উমাক আগত চিনিতা?’
‘না।’
‘ঠিক করি ভাবি দেখো। উমাক আগত কোটেও দেখিছিলা কি?’
‘না।’
আমরা যদি কই যে তুমি উমাক আগত থাকিই চিনিতা। যদি প্রমাণ দেখাই?’ একনা চুপ থাকি মানষিটা ফির কই উঠে, ‘কয়দিন আগত ইটালির সিনকোয়াতেরার মরেস্যোত উমার সাথত তোমার দেখা হইছিলো। ট্রেন স্টেশনের পাশত একটা ক্যাফেত তোমরা বসিছিলা।’
হ্যাঁ, মুই গেইছিনু বটে, কিন্তুক সত্যিই উমাক খেয়াল করি নাই! ট্রেনত যখন দেখিছিনু, তখন একই কেবিনত উমার সাথত থাকিতে মোর একনা অস্বস্তিও হইছিলো।’ একনা থামি ভাবি নিয়া অম্লান কই উঠে, ‘মুই উমাক দেখি অন্য একটা কেবিনত যাইয়া বসি। পাছে সেই কেবিনত আগত থাকি রিজার্ভ করা মানষি উঠায় আবার মোর সিটত ফিরি আসি। উমার কথাবার্তা-ব্যবহারত কেমন যেন উগ্রতা ছিল। যেমন, মোক না পুছি কেবিনের আলো নিভি দিল। জোরে জোরে নিজের মইধ্যে কথা কইছিলো। ফোনত গান চালি দিল। কেবিনের উপর পাকে একটা র্যাক ছিল। ওটা ধরি টানাটানি করিছিলো’… একনা থামি অম্লান আবার কই উঠে, ‘তা উমরা কি কোনো গন্ডগোল করিছে?’
কোনো উত্তর না দিয়া মানষিটা ফির পুছ করে, ‘তারপর কী হইছিলো মনে পড়ে?’
অম্লান চুপ করি থাকে।
‘মনে পড়েছে না? নাকি কইবে না?’
‘নাহ্, মোর আর কিছুই মনে পড়েছে না।’
পাছের একটা মানষি আগি আসে, ‘রোমত, ভ্যাটিকান সিটিত যাওয়ার কথাও মনে পড়েছে না?’ – কইয়া আঙুল দিয়া সামনের দেয়ালের দিকত নির্দেশ করে। দেয়ালটাতও একটা ছবি ফুটি উঠে।
এই কী! এইটা তো অম্লান। উয়ার পাশত ট্রেনের সেই বেটিছাওয়াটা।
অম্লানের মুখ থাকি বিস্ময়সূচক শব্দ বাইর হইয়া আসে।
উমরা একটা বড় চত্বরত খাড়া হইয়া আছে। সামন-পাছত অগুনতি মাথা। ছবিখান যে ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার স্কোয়ারের, তা বুঝিবা সময় নাগিল না অম্লানোর। কিন্তুক ইয়াত ওই কেমন করি গেইল, তাও ওই বেটিছাওয়াটার সাথত।
‘কী পুরা ভিডিয়োটা দেখাম? নাকি তার আগতই কিছু কইবে?’
‘না, এইটার কথা তো কিছুই মনে পড়েছে না। এইটা কবে-কার ঘটনা? ওই ট্রেনত উমার সাথত দেখা হবার পাছে?’
‘ডেভিড, উয়ার ব্রেন ম্যাপিং দেখো তো!’
সামনের নীল জামা মানষিটা কার উদ্দেশে কথাটা কইল বুঝা গেইল না। ঘরের দুইজন মানষির রি-অ্যাকশন দেখি মনে হইল, ডেভিড অন্য কেও, ঘরের বাইরত কোটেও আছে।
মানষিটা আবার অম্লানোক উদ্দেশ্য করি কই উঠিল, ‘তোমার পত্তেকটা কথা সত্যি না মিথ্যা আমরা কিন্তুক সাথত সাথত বুঝি যাইছি। তোমার ব্রেন ম্যাপিং চালু আছে, মিছা কইবার ফল যে ভাল হইবে না, তা না কইলেও চলিবে।’ একনা থামি ফির নীল জামা কই উঠে, ভ্যাটিকান সিটিত যাওয়ার প্ল্যানটা কি তোমার ছিল?’
‘মোর কিছুই মনে পড়েছে না!’
‘পুছের ঠিক উত্তর দেও। সাথের ওই বেটিছাওয়াটার নাম কী ছিল?’
‘জানি না।’
‘তোমরা কি কোনো বিশেষ গ্রুপের সাথত যুক্ত ছিলা?’
‘না। আচ্ছা, ঘটনাটা কী হইছিলো তা একনাও না কইলে মুই কইম কেমন করি? মোর সত্যিই কিছু মনে নাই।’
মানষিটা দ্রুত হাতের তালুত থোয়া মনিটরত ব্রেন ম্যাপিং যন্ত্রের রেজাল্ট দেখি নিল। রেজাল্ট সগ পজিটিভ। অম্লান মিছা কইছে না। একনা অবাক হইয়া পাশের মানষি দুইটার সাথত কী কথা কই নিল।
‘সেদিন তোমরা পোপের বক্তৃতার সময়ত পোপোক হত্যা করিছিলা। দিনটা ছিল ২৫ ডিসেম্বর। যথারীতি হাজার হাজার মানষির জমায়েত হইছিলো সেন্ট পিটার স্কোয়ারত, চার্চের সামনত। দশটার সময় পোপ কইতে শুরু করেন, আর ঠিক পাঁচ মিনিট বাদে তোমরা উয়াক হত্যা করো।’
হতবাক হইয়া খানিকক্ষণ চুপ করি থাকে অম্লান। কোনোরকমে কই উঠে, ‘আ-আমি তো কিছুই বুঝিবা পাইছি না। মুই হঠাৎ পোপোক হত্যা করিবা যাইম কেনে? মুই তো জেনেভা আসিছিনু মোর ব্যবসার কাজত। আর পাঁচদিন বাদেই ফিরি যাওয়ার কথা। ইনফ্যাক্ট ২৫ ডিসেম্বরেই মোর ভারতত ফিরিবার কথা!’ একনা থামি অম্লান কই উঠে, ‘এই ঘটনার কথা কি মোর বাড়িত জানে?’
নীল জামা এতক্ষণত নিজের নাম কয়, ‘মোর নাম সাইমন। এই ঘটনার কথা তোমার বাড়ির মানষি কেনে, সারা পৃথিবীর মানষি জানে।’
‘মুই মোর বাড়ির মানষির সাথত যোগাযোগ করিবা চাই। মুই সঠিক বিচার চাই! মোক অহেতুক ফাঁসানো হইছে। মুই মোর লিগ্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ চাই!’
‘সেটা বোধহয় একনা দেরি হইয়া গেইছে।’ সাইমন কুটিল হাসি কই, ‘তাও তোমার বাড়ির মানষির অনুরোধেই এই কেস রি-ওপেন করা হইছে। উমার ধারণা তোমাক এই কাজ করিবা বাধ্য করা হইছে। তুমি নিরপরাধ। সারা পৃথিবী আজ তোমাক অপরাধী বলি জানিলেও উমরা তা মানিবা নারাজ।’
‘কিন্তুক মুই যে কাজই করি নাই, তার বাদে…’
মানষিটা অম্লানোক থামি দেয়। আবার দেয়ালত ছবি ফুটি উঠে আঙুলের নির্দেশত। ওই একই স্কোয়ার। অম্লানোক আর সাথের বেটিছাওয়াটাক দেখা যাইছে। উমরা এখন একদম সামনের সারিত। পোপ খানিকটা দূরত সেন্ট পিটার চার্চের সামনত উঁচা জাগাত খাড়া হইয়া কিছু কইছেন। চাইরোপাকের বড় বড় মনিটরত পোপোক দেখা যাইছে। হঠাৎ অম্লানোক দেখা গেইল সামনের দিকত ছুটি আগি যাইতে। কয়জন সিকিউরিটি গার্ড অম্লানোক ধরিবা ছুটি আইল। অম্লান উমাক এড়ি দ্রুত পোপের বাদে ঘেরি থোয়া জাগাত চলি আইল। দুইজন সিকিউরিটি অম্লানোক লক্ষ করি গুলি ছুড়িল। কিন্তুক তার আগতই একটা বিশাল বিস্ফোরণ। অম্লানোক ঘেরি একটা ধোঁয়ার বলয়। সেন্ট পিটার চার্চের স্তম্ভগিলাসুদ্ধ কাঁপি উঠিছে। পোপের বাদে তৈরি ঘেরা জাগাখান ভাঙি পড়িছে।
সাইমন কই উঠে, ‘বুঝিতেই পাইছো, তুমিই হইলা সুইসাইড বম্বার। সন্দেহ নাই যে তুমিই পোপের হত্যাকারী। খালি যে পোপোকই তুমি হত্যা করিছিলা তাই-ই নাহয়। সেদিন কয়শ সাধারণ মানষি এই ঘটনাত মরি যায়। এই ঘটনার বাদে নানান দেশত অশান্তি ছড়ি পড়িছিলো। ধর্মযুদ্ধ নাগি গেইছিলো। লক্ষ লক্ষ মানষি তাত মরি যায়। আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছাকাছি পৌঁছি গেইছিলাম। অল থ্যাংকস টু ইউ।’
অম্লান অবাক হইয়া কই উঠে, ‘মুই তাইলে বাঁচি আছি কেমন করি?’
সাইমন মুচকি হাসি কই উঠে, ‘দেড়শ বছর কাটি গেইছে। খালি ঘটনাটা কী ঘটিছিলো, তুমি সত্যিই যুক্ত ছিলা কিনা, তা জানিবা তোমাক খানিকক্ষণের বাদে বাঁচি তোলা হইছে। এই প্রযুক্তি আগত আমার কাছে ছিল না। এখন খালি তোমার ব্রেন চালু আছে। তোমার পরিবার কখনোই তোমাক দোষী হিসাবে বিশ্বাস করিবা চায় নাই। এমনকি এই ছবি দেখিবার পাছতও উমার ধারণা ছিল তোমাক বাধ্য করা হইছে।’
একনা থামি সাইমন নরম গলায় ফির কয়, ‘এখন আমরাও বিশ্বাস করি যে তুমি আসলে দোষী নাহো। তোমাক বাধ্য করা হইছিলো।’
কান্নাত অম্লানোর গলা বুজি আসে, ‘কিন্তুক মোক উমরা এই কাজ করিবা বাধ্য করিল কেমন করি? মোর তো খালি ওই ট্রেনের পথটাই মনে পড়েছে। তারপরে কী হইছে তা কিছুতেই মনে পড়েছে না। আর পুরা ব্যাপারটাই মনে হইছে যেন কালিকার ঘটনা।’ – একনা থামি ফির ধরা গলায় অম্লান কই উঠে, ‘বুবলুর জ্বর হইছিলো। ইন্ডিয়াত তখন রাইত একটা। মুই ফোনত কথা কইছিনু। তারপর – তারপর আর মনে নাই।’
‘তোমাক উমরা ব্যবহার করিছিলো। কারো ব্রেনত চিপ বসি দূর থাকি তাক কেমন করি নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা আমরা জানিবা পাই এই ঘটনার বছর পাঁচেক বাদে। কিন্তুক যখন এর বিচার হয় তখন আমরা তা ভাবিবাও পারি নাই। আসল দোষীগিলা ছাড়া পাইয়া যায়। এখন তো বিজ্ঞান আরও বহুত আগি গেইছে। আমার ধারণা ওইরকমই কিছু তোমার সাথত করা হইছিলো। তোমাক উমরা দূর থাকি কন্ট্রোল করিছিলো। অপরাধ জগতের সাথত তোমার কোনো যোগাযোগ ছিল না বলিয়াই উমরা তোমাক ব্যবহার করিছিলো। যাতে আগত থাকি কেও টের না পায়। যখন তোমার বিচার হয়, তখন এইগিলা প্রযুক্তি সম্বন্ধে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। তাই সগায় ধারণা হয় যে তুমিই ষড়যন্ত্রের সাথত যুক্ত ছিলা।’
আচ্ছা, মিনু, বুবলু – উমরা ভালো…?’ পুছটা করিবা যাইয়া থামি যায় অম্লান। দেড়শ বছর আগের কথা। কায় আর উমার খবর থুইছে?
‘মুই তোমারই বংশধর। তোমার ছাওয়া মোর ঠাকুরদা ছিলেন। তাই তো মুই এই কেসটার দায়িত্ব নিছিনু। আশা করি, আমরা এভিডেন্স থাকি তোমাক নির্দোষ প্রমাণ করিবা পারিম। সারা পৃথিবী আর তোমাক দোষ দিবে না, ঘৃণার চোখে দেখিবে না। তোমাক আর কৃত্রিমভাবে বাঁচি থুইয়া আমরা কষ্ট দিম না। বিদায় দাদামশাই।’
অম্লানোর চোখের সামনত বুবলুর হাসিভরা মুখখান ভাসি উঠে। স্পষ্ট যেন উয়ার ডাক শুনিবা পায়। এইটা যেন ঠিক কালিকার ঘটনা। তারপর বুবলুর মুখখান মিলি যায় আন্ধারত। টানেলের থাকিও ঘন আন্ধারত।
---
বুলিবদল: Bhawaiya Blog
হালিচা:
ভুতের গপ্পো