শাঁকচুন্নির কারসাজি - লোক গপ্পো

বামাপদ কলকাতাথ এখান মুদি দোকানত কাম কচ্ছিল। মানষিটা ছিল বড় ভাল। বড় শত্রুও উয়ার পোশংসা না করি থাকির পায় না। 

বছরের শ্যাষত একবার করি বামাপদ দ্যাশত আসে। যখুন উয়ায় দ্যাশের বাড়িত পাও দ্যায়, তখুন গাঁয়ের ছোট-বড় সগায় খুব খুশি হয়। সগার সাথেই খুব হাসি-খুশি করিছিল উয়ায়। সেইতানে সগায় খুব ভালবাসে উয়াক। 

কয়দিন দ্যাশত কাটায় আবার উয়ায় কলকাতাত ফিরি যায়। বামাপদর মাওক একলায় গাঁওত থাকির নাগে। কিন্তুক তাও উয়ায় কোনোদিন গাঁও ছাড়ি কলকাতাত যাবার কাথা মুখত আনে নাই। স্বামীর ভিটার উপর উয়ার আছিল এমুন টান। 

সেইবারও বছরের শ্যাষত বামাপদ দ্যাশত ফিরিল। 

বামাপদর মাও উয়াক কইল— ‘বাবা পদ, এবার শহরত যাবার সমায় কিন্তুক বউমাক শ্বশুরবাড়ি থাকি আনি দিয়া যাইস। মোর একলায় এই ভিটাত আর থাকির পারো না। আর মোর বয়সও হইছে ম্যালা। কবে আছোঁ, কবে নাই। আর সংসারের এত কামকাজইবা করে কায়? 

যাবার সমায় এবার তুই 
বউক আনি দে, 
আর কয়দিন বাঁচিম মুই 
কওয়া না যায় সেডে। 

বামাপদ কইল— ‘ভালা তো! উয়ার তানে আর এত চিন্তার কি আছে? মুই কাইল-পরশু নাগাদ যাওছোঁ শ্বশুরবাড়ি।’ 

বামাপদর বাড়ি থাকি উয়ার শ্বশুরবাড়ি বিশ-পঁচিশ কোশ। দুই-তিন দিনের পথ। রেলরাস্তার ধারত নোহায় বুলিয়া বামাপদক ওতখানি পথ হাঁটি যাবার নাগে। কিন্তুক হাঁটি যাবার মন সরে নাই বামাপদর। সেইতানে উয়ায় পালকি, বেহারার বন্দোবস্ত করিল। বউক আনিবার তানে এক ঝিক নেওয়া হইল সাথত। দুইদিন পরে বামাপদ শ্বশুরবাড়ি পৌঁছিল। 

শ্বশুরবাড়ি থাকি বউক সেইদিনেই সাজেয়া-গুছেয়া বামাপদ রওনা হইল। 

গরমের দিন। আম, জাম, লিচু পাকেছে। ভীষণ গরমের মইধ্যে পথ চলা প্রায় অসম্ভব। 

সকাল সকাল উমরা রওনা হইছিল। 

কিন্তুক দেখিতে দেখিতে দুপুর হয়া গেল। রইদের ভীষণ ত্যাজত পথ চলায় যায় না। সগায় হাঁপি উঠিল। 

গরমকালের দুপুর রইদত 
আগুন যেন ধরে, 
পথ চলিতে সগায় যেন 
ক্লান্ত হয়া পড়ে। 

পালকির বেহারাগিলা যেটুকুও বা হাঁটির পারছিল, ঝি তো তাও পারছিল না। 

উয়ায় তখুন বামাপদক কইল— ‘বাবু, একনা হুকুম দেন তো হামরা এনা জিরেয়া নিই।’ 

বামাপদ দেখিল ঠিক কাথা। উয়ায় কইল— ‘ভালা, তোমরা এনা জিরেয়া নেও। মুই বরং হাটত যেয়া কিছু খাবার কিনি আনোঁ।’ 

বেহারাগিলা কইল— ‘ভালা বাবু, হামরা তালে উনুন খুঁড়ি, আপনে চাইল ডাইল কিনি আনেন।’ 

ঝি নিশ্চিন্তমনে বিশ্রাম করির নাগিল। বেহারাগিলা এনা দূরত উনুন খুঁড়ির নাগিল। বামাপদ বাজারত গেল জিনিস কিনির তানে। নয়া বউ পালকির মইধ্যেই বসি রইল। 

এদিক দারুণ গরমত বউয়ের খুব তিস্না নাগিছিল। উয়ায় একসমায় ঝিক কইল— ‘দূরের পুকুরটা থাকি এনা জল আনি দেও না। ভারি তিস্না নাগিছে। 

ওই যে দূরত পুকুর দেখোঁ 
টলটলা জল তার 
জল আনি দেও, তিস্নাতে যে 
পরান বাঁচে না আর।’ 

ভীষণ গরমত ঝি এতখানি পথ হাঁটি একেবারে মরার নাখান ক্লান্ত হয়া পড়িছিল। সেইতানে উয়ায় গজগজ করির নাগিল— ‘বামাপদর মাক সেই তখুনে কইছোঁ, এতদূর দ্যাশত ছাওয়ার বিয়াও দেন না। তা তখুন গরিবের কাথা গেরাহ্যিই করিল না।’ 

বউ দেখিল, ঝির সাথত তর্ক করিলে আর জল খাওয়া হইবে না। সেইতানে উয়ায় কইল— ‘তুই এনা বইস ঝি, মুই নিজেই যেয়া জল খায়া আসোঁ।’ 

এই কাথা শুনি ঝি তো মহাখুশি। উয়ায় কইল— ‘তাই কর মা, তাই কর। এই তো কাছেই দীঘিটা।’ 

বউ আর কাথা না কয়া পালকি থাকি নামি দীঘির দিকত আগেয়া গেল। 

এদিক সেই দীঘির ধারত ছিল বড় বড় কয়খান তালগাছ। সেই তালগাছগিলার কোটরত বাস করিছিল কয়টা পেত্নি। 

সেই পেত্নিগিলার মইধ্যে একটা পেত্নির ঠিক সেইসমায় দারুণ জলতিস্না নাগিছিল। উয়ায় জল খাবার তানে ঘাটের দিকত আসেছে এমন সমায় বউয়ের সাথত নাগিল উয়ার ধাক্কা। 

আর যায় কোটে! 

পেত্নি তো রাগি আগুন! কী, এতবড় আম্পর্দা যে মোর গাওত ধাক্কা নাগায়! 

মোর গাওত ধাক্কা নাগায়— 
স্পর্দা দেখোঁ বড়ো, 
আচ্ছা মজা দেখাছোঁ আজি, 
এনা সবুর করো। 

পেত্নি তখুনে নিজমূর্তি ধরি খাড়া হয়। 

উঃ, কী বিশাল উয়ার চেহারা! মুলার নাখান দাঁত, তালগাছের নাখান ঠ্যাং, লম্বা লম্বা হাত, কুলার নাখান কান। 

বউ তো পেত্নির মূর্তি দেখিয়ায় সাথতে সাথতে অজ্ঞান। 

আর যায় কোটে! 

পেত্নি তখুনে বউক তুলি নিয়া উড়িতে উড়িতে যেয়া হাজির হইল একেবারে সেই তালগাছের মাথাত। 

তারপর বউক অজ্ঞান অবস্থাত সেটে থুইয়া বিড়বিড় করি মন্তর পড়িল। 

বউয়ের আর তালগাছ থাকি নামিবার খেমতা রইল না। 

পেত্নি তখুন বউয়ের কাপড় নিয়া নিজে সেইগিলা পরি ফেলিল। 

তারপর সুন্দরী বউটি সাজি সোজা যেয়া হাজির হইল সেই পালকির সামনত। 

বউটি সাজি পেত্নি তখুন 
পালকির ধারত যায় 
পেত্নি বলি কায়ো সেটে 
চিনিল না তায়। 

ঝি কইল— ‘কি গো বউ, জল খাওয়া হইল?’ 

বউ হাসি কইল— ‘হয়।’ এই কয়া উয়ায় পালকির মইধ্যে যেয়া চুপচাপ বসি রইল। এনা পরে রান্নাবান্না খাওয়া-দাওয়া শ্যাষ করি সগায় আবার পালকি নিয়া রওনা হইল। 

বউ অজ্ঞান হয়া সেই তালগাছের কোটরের মইধ্যেই পড়ি রইল। কায়ো জানির পাইল না। 

এদিক সেইদিনে সইন্ধ্যায় পালকি আসি থামিল বামাপদর বাড়িত। 

বামাপদর মাও তো মনের আনন্দে বউক বরণ করি ঘরত তুলি নিল। 

দিন যায়। 

বউয়ের কামকাজ দেখি বামাপদর মাও খুব খুশি। ইয়ার আগত উয়ায় দেখিছিল বউ ভীষণ আলসি। কোনো কামকাজ করির পায় না। 

কিন্তুক এবার দেখিল কোনো কাম করির কবার আগতেই বউ সাথতে সাথতে উয়ায় করি ফ্যালায়। 

তাছাড়া আগত বউ বড় গম্ভীর ধরনের আছিল। সবসমায় মুখ গোমড়া করি বসি থাকিত। কিন্তুক এবার বউ খুব চটপটা। কিছু কবার আগতেই উয়ায় হাসিতে হাসিতে কামকাজ শ্যাষ করি হাসি-খেলি সমায় কাটায়। 

বউয়ের স্বভাব বদলি গেইছে— 
নোয়ায় উয়ায় কুঁড়া আর, 
হাসি খেলি কাম করে উয়ায়; 
মুখ করে না ভার। 

শাশুড়িও বেশ আনন্দেই দিন কাটাবার নাগিল। 

বামাপদও দেখিল এবার বউ যেন আগের থাকি ম্যালা বেশি সুন্দরী। কী করি যে এমন হইল তা উয়ায় ঠিক বুঝির পাইল না। তাও এত উয়ায়ও খুব খুশি হইল। 

এমন করি দিন যায়। 

দেখিতে দেখিতে কিছুদিন কাটি গেল। 

বামাপদ একদিন মাও-বউক থুইয়া চলি গেল কলকাতাত। যাবার সমায় মাওক কয়া গেল— ‘খুব সাবধানে থাকিস।’ 

মাও কইল— ‘তুই কামত উন্নতি কর বাবা। আরো বেশি ট্যাকা পাইলে হামরা সগায় মিলি শহরত যেয়া থাকিম। 

গাঁওত আর মন বসে না— 
হছে অভিলাষ 
শহরত সগায় মিলি 
করিম হামরা বাস।’ 

বামাপদর মাও ভাবিল যে বামাপদ চলি গেলে বউ হয়তো এনা মনমরা হয়া থাকিবে। কিন্তুক দেখা গেল ঠিক উয়ার উলটা। কামকাজত বউ আরো বেশি মন দিল। কাথা শ্যাষ করিবার আগতেই উয়ায় কাম করি ফ্যালায়। 

একদিন বামাপদর মাও দাওয়াত বসি মশলা বাটেছে। 

বউক কইল— ‘বউ, আরো কিছু মশলা আনি দেও তো ঘর থাকি।’ 

বউ সেটে খাড়া হয়ায় বিরাট লম্বা একখান হাত বাইর করি দিল ঘরের দিকত। 

বামাপদর মাও পইলা তা দেখির পায় নাই। 

উয়ায় হঠাৎ মুখ ঘুরি দেখির পাইল যে বউ লম্বা এক হাত বাইর করি ঘরের মইধ্য থাকি জিনিস আনেছে। 

ভয়ত বামাপদর মাওর গাওত কাঁটা দিয়া উঠিল। উয়ায় তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরি নিল। কিন্তুক মনের মইধ্যে সেই যে ভয় ঢুকিল, তারপর আর কোনো কাম করির পাইল না উয়ায়। 

বামাপদর মাও দুই-একজন পাড়াপড়শির কাছত চুপে চুপে কাথাটা জানাইল। 

উয়ায় কইল— 

‘আজ সকালত দেখির পালোঁ মুই অকস্মাৎ, 
বউটি মোর মশলা আনে বাড়েয়া উয়ার হাত। 
সরে উয়ায় কী লম্বা দুই-হাত বাড়েয়া দিল তার— 
দৃশ্য দেখি ভয়েত মোর বুক কাঁপে বার বার।’ 

কিন্তুক উমরা কইল— ‘না না, তুই ভুল দেখিছিস। না-হয়, তোর বায়ু চড়িছে। অমন লক্ষ্মী বউ, উয়ার নামত এমন সব কাথা কইছিস!’ 

শাশুড়ি কী আর করে, মনের ভয় মনেই চাপি রইল। 

…এমন করি আরো দিন কয়েক কাটি গেল। 

একদিন বউক রান্না করির কয়া বামাপদর মাও ঘাটত গেল কাপড় ধুইবার। 

এনা পরে কাপড় ধোয়া শ্যাষ করি রান্নাঘরত গেল বউয়ের রান্না দেখির। 

কিন্তুক সেটে যেয়া উয়ায় যা দেখিল তাতে উয়ার চখু স্থির হবার জো। 

উয়ায় দেখিল বউ উনুনের সামনত বসি। উয়ার দুইটা ঠ্যাং উনুনের মইধ্যে ঢুকানো আছে। সেই ঠ্যাং দুইটা থাকি দাউদাউ করি আগুন বাইর হয়া। আর সেই আগুনত ভাত, ডাইল ফুটেছে টগবগ করি। 

উনুনের মইধ্যে কাঠ-খড় কিচ্ছু নাই। 

অবাক কাণ্ড। নিশ্চয় এই বউ মানুষ নোয়ায়। পেত্নি, না হয় শাঁকচুন্নি। 

এই বউ মানুষ নোয়ায় দেখোঁ অদ্ভুত— 
মানুষের বেশে কোনো হইবে প্রেত-ভূত। 
কাঠ-খড় নাই কিছু, তাও কত গুণ— 
ঠ্যাঙের আগুনে শুধু জ্বলেছে উনুন। 

কিন্তুক কিছু কইলেই বউ তো রাগি উয়াকেই শ্যাষ করি ফেলিবে। সেইতানে চুপচাপ থাকি উয়ায় ছাওয়ার কাছত চিঠি লেখি ফেলিল। তারপর একজন প্রতিবেশীক দিয়া চিঠিটা ডাকঘরত পাঠেয়া দিল। 

চিঠি পায়া দুই-দিনের মইধ্যেই বামাপদ দ্যাশত ফিরি আইল। বউ তো এত তাড়াতাড়ি বামাপদক ফিরিতে দেখি অবাক হয়া গেল। 

বামাপদর মাও সব কাথা উয়ার ছাওয়াক জানাইল। 

বামাপদ তো এইসব কাথা শুনি অবাক। এই কী করি সম্ভব হবার পারে। ঠিক উয়ার বউয়ের নাখানেই তো চেহারা! 

বামাপদর মাও কইল— ‘আচ্ছা চখে দেখিলে বিশ্বাস করবু তো?’ 

বামাপদ কইল— ‘হয়, চখে দেখিলে বিশ্বাস না করিবার কি কারণ আছে?’ 

তখুন শাশুড়ি বউক কইল— ‘বউমা, মুই এদিকের কামত যাওছোঁ, তুই চট করি এই কাপড়গিলা ধুইয়া আন তো দেখি।’ 

বউ কাপড়গিলা নিয়া চলি গেল। 

এনা পরে বামাপদর মাও গোপনে বামাপদক ঘাটের ধারত নিয়া গেল। সেটে যেয়া উমরা দেখে বিরাট দুইটা লম্বা লম্বা হাত বাইর করি বউ দমাদম কাপড়গিলাক আছাড় মারেছে। 

মাওয়ের সাথত বামাপদ 
দেখিল ঘাটের কাছত— 
লম্বা বিরাট দুইটা হাতত 
বউটি কাপড় কাচে। 

বামাপদ কোনো কাথা কইল না। উয়ায় বুঝির পাইল যে এই বউ উয়ার আসল বউ নোয়ায়। নিশ্চয় এই পেত্নি উয়ার বউক কুনোঠে লুকেয়া থুইয়া নিজে বউ সাজি আইসছে। 

মাও-বেটা দুইজনে তখুন যুক্তি করি একজন ওঝাক ডাকি আনিল। ওঝা আর বামাপদ দুইজনে বাইরত বসি কাথা কইছিল। 

এদিক পেত্নি-বউ ঘরের মইধ্যে শাশুড়িক কইল— ‘মা, ও হতভাগা কায়? তোমার ছাওয়ার সাথত গপ্প করেছে ক্যেনে? উয়াক এক্ষুনি বাড়ি থাকি খেদি দেও! 

কছোঁ মাগো উচিত কাথা 
ভালাই যদি চাও, 
ওই লোকটাক বাড়ির থাকি 
খেদেয়া তুমি দাও।’ 

মাও কইল— ‘বউমা, কুনঠাকার কোন লোক বামাপদর সাথত কাথা কছে, তাতে হামার কি ক তো?’ 

বউ কইল— ‘না মা। ওই লোকটাক দেখিয়ায় মনে হছে যে ওই লোকটা ভালা নোয়ায়।’ 

শাশুড়ি আর বউ কাথাবার্তা কইছে, এমন সমায় বামাপদ ওঝাক নিয়া বাড়ির মইধ্যে ঢুকি পড়িল। 

বউ ওঝাক দেখিয়ায় দূরত সরি যাইছিল। 

ওঝা কইল— ‘বউমা, এনা খাড়া হবার নাগিবে। যাছেন কোটে মা? তোমার সাথত যে মোর ম্যালা কাথা আছে।’ 

বউ তখুন ভীষণ রাগি নিজমূর্তি ধরি কইল— ‘ক্যেনে রে হতভাগা! তোর সাথত মোর কি?’ 

ওঝা কইল— ‘এই যে কী তাই দেখাছোঁ! পালাবু কোটে? পালাবার উপায় কি থুইছি নাকি। চাইরদিকত গণ্ডি দিয়া থুইছি। এখুনো নিজের মঙ্গল চাও তো কও তুই কায়? আর উমার বউক কোটে আটকি থুইছিস?’ 

বউ তখুন ভীষণ মূর্তি ধারণ করি ওঝার দিকত ছুটি আইল। 

ওঝা কয়টা সরিষাত কী যেন মন্তর পড়ি তা বউয়ের দিকত ছুড়ি মারিল। 

সাথতে সাথতে বউয়ের নড়াচড়া বন্ধ হয়া গেল, উয়ায় চুপ করি খাড়া হয়া রইল। 

ওঝা তখুন মন্তর পড়ি বউয়ের গাওত ধুলার বাণ মারির নাগিল। 

বউ তখুন প্রাণপণে চিকরি নাগিল— ‘কায় কোটে আছেন রক্ষা করো। মোক মারি ফেলিল! 

দৌড়ি আসো, দৌড়ি আসো 
কোটে আছেন কায়, 
গিরস্তের বউ যে মুই— 
মারি ফেলিল যে।’ 

চিকরানি শুনি সারা গাঁওয়ের মানষি ছুটি আসি উমার উঠানত জড়ো হবার নাগিল। ওঝাও ছাড়ি দিবার পাত্র নোয়ায়। উয়ায় কইল— ‘এখুনো কছোঁ উমার বউক ছাড়ি দেও। না হইলে কিছুতেই তোর নিস্তার নাই।’ 

পেত্নি তখুন ভয়ে ভয়ে কইল— ‘উমার বউক মুই গাছের কোটরত থুইয়া আইসছোঁ। 

দীঘির ধারত তালের গাছত 
তোমার উয়ায় বউটি আছে। 

ওঝা জিজ্ঞাসা করিল— ‘কতদিন?’ 

পেত্নি কইল— ‘যেইদিন বাপের বাড়ি থাকি এঠে আসছিল ঠিক সেইদিন।’ 

ওঝা তখুন জিজ্ঞাসা করিল— ‘উয়ায় কি এখুনো বাঁচি আছে?’ 

পেত্নি কইল— ‘হয়, মুই রোজ উয়াক খাবার খুয়েয়া আসোঁ।’ 

ওঝা এবার জোর চিকরি কইল— ‘এবার উয়াক এক্ষুনি এঠে আনি দেও দেখি।’ 

পেত্নি চুপ করি আছিল। ওঝা উয়ার গাওত আবার ধুলার বাণ মারির নাগিল। 

এবার আর উপায় না দেখি পেত্নি কইল— ‘খাড়াও বাবা, মুই এখুনে তোমার বউমাক আনি দেছোঁ।’ 

ওঝা কইল— ‘ভালা, সেই তো খুব ভালা কাথা। কিন্তুক আর এক মুহূর্তও দেরি নোয়ায়।’ 

পেত্নি তখুন সগাক চখু বুজির কইল। সগায় চখু বুজিলে ‘শোঁ শোঁ’ শব্দ করিতে করিতে একঝলক ধোঁয়ার নাখান পেত্নি উড়ি চলি গেল। দেখিতে দেখিতে কিছুক্ষণ কাটি গেল। 

আবার শোনা গেল ‘শোঁ শোঁ’ শব্দ। দেখা গেল বামাপদর আসল বউক কোলাত করি নিয়া আসেছে পেত্নি। পেত্নিক দেখাছে বিরাট একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলীর নাখান। 

বামাপদর বউ তখুন অচৈতন্য। 

ওঝা তখুন জিজ্ঞাসা করিল— ‘তুই কি এক্ষুনি এদ্যাশ ছাড়ি চলি যাবু, না থাকবু? যদি থাকির চাস তালে আবার কিন্তুক তোক বাণ মারিম।’ 

পেত্নি কইল— ‘না, মুই এদ্যাশ ছাড়ি চলি যাইম।’ 

উমরা কইল— ‘কিন্তুক আর কখুনো এদ্যাশের দিকত আসির পারবু না।’ 

পেত্নি কইল— ‘আচ্ছা মোক এবার মুক্তি দেও।’ 

ওঝা কইল— ‘যাবার আগত এই বড় নিমগাছটা ভাঙি দিয়া চলি যা।’ 

পেত্নি কইল— ‘আচ্ছা।’ 

সাথতে সাথতে শোনা গেল ভীষণ একটা ঝড়ের নাখান প্রচণ্ড শব্দে একঝলক বাতাস বহি যাছে। 

উয়ায় কী ভীষণ শব্দ! 

এনা পরেই মড় মড় করি বড় নিমগাছটা উপড়ি পড়িল। পেত্নিকও আর দেখা গেল না। 

হঠাৎ যেন প্রবল ঝড়ত 
নিমগাছটা উপড়ি পড়ে; 
গাঁওবাসীরা দেখিল সগায়, 
পেত্নি গেইছে, আর ভয় নাই। 

বউয়ের মাথাত জল ঢালিতে ঢালিতে উয়ার জ্ঞান ফিরি আইল। 

উয়াক জিজ্ঞাসা করা হইল— ‘তুই কোটে আছিলু এতদিন?’ 

বউ কইল— ‘মুই দীঘিত জল খাবার গেনো। কিন্তুক মাঝপথত জ্ঞান হারি গেল। তারপর আর কিছু মনে নাই।’ 

বামাপদ আর উয়ার মাও এরপর আসল বউক নিয়া মনের সুখে ঘর সংসার করির নাগিল। 

সেই পেত্নি আর কোনোদিনও উমার ছায়া মাড়ায় নাই। 

---

বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ 

Post a Comment

Previous Post Next Post