হামার গেরামের পাশত একখান বড় আমবাগান আছিল। ছোটকালে শুনচি, ওই বাগানের উত্তরের কোণত নাকি রাইতত অদ্ভুত অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। গেরামের বুড়া-বুড়ি কইত, ওঠে এক বউ বহুত বছর আগত গলাত দড়ি দিয়া মরি গেইছিল। সেই থাকি রাইতত বাগানত গেইলে মানষি নাকি বেহুঁশ হয়া যায়, না হয় ডরানি কাণ্ড দেখে। মুই এইলা কথা বিশ্বাস করং নাই। কিন্তু এক পুন্নিমার রাইতত বন্ধুলার সাথত মজা করিবা গিয়া বাগানের ভিতরত সোন্দেয়া যে কাণ্ড দেখলুং, সেইটা আইজও মনে পড়িলে গাও কাঁপি উঠে।
হামরা চাইরজন বন্ধু আছলুং। চান্দের আলোত বাগানটা তকন বড় সোন্দর লাগছিল। পাতলা বাতাসত গাছের পাতালা দুলছিল। হাসি-ঠাট্টা করিতে করিতে যকন ভিতর পাখে যাবার ধরচি, হঠাৎ শুনলুং কায়বা খুব আস্তে গান গাবার ধরছে। অবাক হয়া একে-অপরের মুখত চাইলুং—এত রাইতত, এত ভিতরত গান আসে কোটে থাকি? গলাটা আছিল মাইয়ামানষির, কিন্তু মনে হয় যেন বহুত দূর থাকি ভাসি আসেছে। বন্ধুলা হাসি হাসি কইল, “আরে, এইলা খালি মনের ভুল।” কিন্তু মোর বুকের ভিতরত কেমন যেন অসুবিধা করিবা ধরল।
আরো একনা আগেয়া যাইতেই বাতাসটা হঠাৎ জমি গেল। চাইরপাক একেবারে ঠাণ্ডা হয়া গেল, অথচ বাইরত গরম কালের গরমি। তকনিই চোখত পড়িল—একটা আমগাছের তলত সাদা শাড়ি পিন্দা এক ঝন মাইয়ামানষি খাড়া হয়া আছে। মাথা নিচা করা, চুল ঝুলি আছে আগপাকে, হাতত কেমন একখান মালা। হামরা ডরত জমি গেলুং। ঠ্যাং কাঁপছে, কিন্তু কাহারো সাহস হয় নাই দৌড় দিবার। হঠাৎ উয়ায় মাথা তুলি চাইল। উয়ার চক দুইটা জ্বলজ্বল করছে, যেন আগুনের নাখান নাল। সেই চাহনিত এত ডর আছিল যে মোর বুকের ধুকপুকানি বন্ধ হয়া আইসছে।
বন্ধুলা চিকরি দৌড় দিবা ধরল। মুইও কোনোমতে দৌড় শুরু করলুং। দৌড়িবার সময় মনে হয়ছে, পাছ থাকি কায়বা হামাক খেদি আসেছে। গাছের ডাল ভাঙার শব্দ, কেমন কান্দন, আর সেই মাইয়ামানষির গান হামার কানত বাজিবা ধরল। শেষমেশ বাগান থাকি বাহির হয়া গেরামের বড় রাস্তাত আইসতেই সব শব্দ থামি গেল। হামরা হাঁফাইতে হাঁফাইতে একে-অপরের মুখত চাইলুং—কাহো কিছু কবার পায় নাই।
পরেরদিন সাকালবেলা গেরামের এক বুড়িমার কাছত ঘটনাটা কইলুং। উয়ায় শান্ত গলায় কইল, “ওই বাগানত যাইস না বাপো। যে মাইয়ামানষিটা ওঠে জান দিছিল, উয়ায় আইজও শান্তি পায় নাই। পুন্নিমার রাইতত উয়ায় গান গায়, আর উয়ার ছায়ার কাছত গেইলে মানষি আর ভালো থাকে না।”
সেই দিন থাকি মুই আর কুনোদিন সাহস করি বাগানের পাকে যাং নাই। তে আইজও মাঝে মইধ্যে পুন্নিমার রাইতত ঘরের উঠান থাকি দূরত চাইলে মনে হয়, বাতাসের সাথত ভাসি আসেছে সেই দুকখি গানের সুর।
গপ্পো জোটাইয়া: ভাওয়াইয়া ব্লগ