ঘুম ভাঙিতেই রজত টের পাইল্, ট্রেইনটা ইস্টিশনত খাড়াইছে। বাইরত হকারগিলার চিল্লানি, ব্যস্ত মানষিগিলার মাল-পত্র নিয়া এদি-ওদি দৌড়াদৌড়ি। কয়েকজন মানষি কৌতূহলী চউখে ট্রেইনের পাকে তাকাছে। এসি ফাস্ট ক্লাসের জানালার কাঁচত নাক ঠেকিয়া ভিতরত কাঁয় আছে দেখিবার চেষ্টা করছে।
মোটা কাঁচের জানালার ওপারত ইস্টিশনের নামটা পড়িবার চেষ্টা করিল্ রজত। বাইরত প্ল্যাটফর্মের মিটমিটিয়া আলোত ইস্টিশনের নামের আধখান দেখিয়া আন্দাজ করিল্—টাটানগর। মাঝরাইত পার হই গেইছে। খানিকক্ষণ খাড়াইবে এটে ট্রেইনটা। বোধায় খাবার তোলা হইছে।
হাওড়া থাকি ট্রেইনত চড়িবার সোমায় ও একলায় আছিল্ কেবিনত। কিন্তুক এলায় আর ও একলা নাহায়। মাঝত কোনো ইস্টিশনত কাঁয়ো একজন উঠিছে। কোনো একজন কওয়ায় ভাল, কারণ তার আর অন্য কোনো পরিচয় পাওয়ার উপায় নাই। উল্টা পাকে মুখ করি শুতি আছে! পাওয়ের পাকে খালি একটা পুরানা দিনের ভারী সুটকেস। এসি ফাস্ট ক্লাসের সাথত একেবারেই মানান নাহায়। কান্ধ অবধি কম্বল টানি দিব্যি নিশ্চিন্তে ঘুমাছে।
ট্রেইনত উঠিবার পাছতেই খাবার দিছিল্। খাবার প্লেটটা এ্যালাও পড়ি আছে। ওটাক সিটের নীচত ভিতর পাকে ঠেলি দিয়া লেখার খাতাটা বাহির করিল্ রজত। মাথার কাছের বাতিটা জ্বালি দিল্। বাকি কেবিনের আন্ধার আরো খানিক বাড়ি দিয়া সাদা আলো উয়ার সিটের ঠিক মাথার উপর ছড়ি পড়িল্। অনেকক্ষণ ঘুম হইছে। এলায় ঘুম একবার যখনি ভাঙিছে, চট করি আর আইসপে না। তায় দিব্যি খানিকক্ষণ নিশ্চিন্তে গল্প লেখা যাইবে।
ইদানিং দুই-একটা ম্যাগাজিনত লেখা বাহির হয় রজতের। উয়ার পেশাটা যদিও আলাদা। সিএ পাস করি একটা মাঝারি মানের কোম্পানিত চাকরি করে ও। লেখাটা মূলত উয়ার নিশা। তায় সোমায় পাইলেই কাগজ-কলম নিয়া বসি যায়। সবে লেখা শুরু করিবে, এমন সোমায় বাধা আইল্।
কেবিনের দুয়ার খুলি এক প্রকাণ্ড চেহারার ভদ্রলোক সান্দাইল্। ছয় ফুটের উপর হাইট। ডাইন গালত জড়ুল। ফর্সা। চেপ্টা নাকের উপর একটা রিমলেস চশমা। চউখের নীচের অংশটা বসা। মাথা ভর্তি পাকা চুল। বয়স ষাইটের কাছাকাছি হইবে। বেশিও হইতে পারে। অ্যাথলেটিক, মেদ নাই চেহারাত। জামা-কাপড় দেখিয়ায় বুঝা যায় বেশ অবস্থাপন্ন। ভদ্রলোকক দেখিয়ায় খুব চেনা মনে হইল্ রজতের। ক্যানে ঠিক খেয়াল করিবার পাইল্ না।
দুইটা ব্যাগ কুলিক দিয়া বাঙ্কের নীচত ঢুকি থুইতে কয়া রজতের উল্টা পাকে আসি বসিল্। উপরের বাঙ্কের ভদ্রলোকের পাকে ইশারা করি কইল্, ‘একেলগে?’
—না, ওনাক মুই চিনি না।
—গুড, এক কেবিনত তিনজন—কাঁয়ো কাহোকে চিনি না। ভাল, মোর নাম আশিস মাইতি, তা তোর নাম কী? কী করিস?
—মুই রজত। সবে চার্টার্ড পাস করি চাকরিত ঢুকিছু।
—তা, অফিসের কামে?
—না, এমনেই বাহির হইছু। এলায় সোজা পুনে। ওটে থাকি গোয়া। সাত দিনের ট্রিপ।
—কস কী! একলা! তোর বয়সত একলা ট্রিপ? তা বন্ধুবান্ধব কাঁয়ো নাই?
মাথা নাড়ি মুচকি হাসিল্ রজত। জানে সবারে এইটা খুব অদ্ভুত লাগিবে। উয়ার নাকান বয়সের একজনের একলা একলা ঘোরা। আসলত ছোটোবেলা থাকিয়ায় রজত খুব একলা একলা থাকিত্। এলায় সেইটা অভ্যাসত খাড়াইছে। বাপ খুব কম বয়সত মরি গেইছে। তার পাছত মামার বাড়িত মানষি। বড় মামার খুব শাসন আছিল্। বাড়ির বাইরত কারো সাথত মেলামেশা একদম পছন্দ করিত্ না। মা’ও বাপের হঠাৎ মরণত এমন আঘাত পাইছিল্ যে কখনোই বাড়ির বাইরত বাহির হইত্ না। সব নাকান আনন্দ-উৎসব এড়ি চলিত্। আর তারে ছায়া পড়িছিল্ রজতের উপরেও।
আশিসবাবু মানিব্যাগ থাকি বিজনেস কার্ডটা বাহির করি রজতের পাকে আগি দিল্, ‘পুরানা বিজনেস কার্ড। তিন মাস হইল্ রিটায়ার করিছু। বায়োমেডের নাম শুনিছিস?’
—হ্যাঁ, তা শুনিম না! ভারতের এক নম্বর ওষুধ বানানের কোম্পানি। আর তা ছাড়া…
—’ম্যানেজিং ডিরেক্টর আছিলু’—রজতক কথাটা পুরা করিবার না দিয়ায় আশিসবাবু কয়া উঠিল্। কয়া একটু গর্বের হাসি হাসিল্।
—চাইর-চাইরটা বছর। এক সোমায় বায়োমেডক কাঁয়ো চিনিত্ না। মোর জন্যই—এই আশিস মাইতির জন্যই বায়োমেডক এলায় সারা দুনিয়া চিনে।—কয়া কোটের পকেট থাকি একটা কাঠের বাক্স হাতত নিয়া একটা চুরুট বাহির করিল্।
—লাইটার আছে?—একটু থামি কয়া উঠিল্ আশিসবাবু।
—নাহ, মুই স্মোক করি না।
—মোর লাইটারটা ওই ডাইন পাকের লেদারের ব্যাগটার সাইড পকেটত আছে। বাহির করি দে তো—বেশ হুকুমের নাকান কয়া উঠিল্ আশিসবাবু।
রজতের হাত থাকি লাইটারটা নিয়া চুরুট জ্বালি একটা তৃপ্তির টান দিয়া উপরের বাঙ্কের পাকে তাকি কয়া উঠিল্—’লোকটা মরার নাকান ঘুম নাগাইছে দেখেছি। আর সাথত আবার মান্ধাতা আমলের ব্যাগ। কোনো সেন্স নাই। মোর অফিসত ঠিক এই নাকান একটা ব্যাগ নিয়া কাঁয়ো একজন আসিত্—ঠিক খেয়াল হইছে না। তা যাউকগে, বায়োমেডের কোনো ওষুধের নাম জানিস?
—অ্যাসিবিওন। মাথাব্যথার ওষুধ।
—বাহ, জানিস তাইলে, খুব হিট প্রোডাক্ট। মোর রিসার্চ টিমেই করিছিল্। সেই প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা।
—মোর বাপও বায়োমেডত কাম করিত্। অনেকদিন আগত।
—’তাই!’—একটু অবাক হইল্—’কী নাম ওনার?’
—রঞ্জন চ্যাটার্জি। রিসার্চ সায়েন্টিস্ট আছিল্।
কেবিনের আবছা আলোত মনে হইল্ আশিসবাবু যেন একটু চমকি উঠিল্—’রঞ্জন!’
—আপনি বাবাক চিনিতেন? উনি তোমারলার গুরগাঁও অফিসত কাম করিত্।
একটু গলা খাঁকারি চুরুটের ছাইটা নীচের কার্পেটের উপর ফেলি টান হই উঠি খাড়া হইল্ আশিসবাবু।
—নাহ বড় কোম্পানি তো। অনেক এমপ্লয়ি আছিল্। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট হইলে চিনিবার পাইতুং। মোর তো সব সিনিয়র লোকের সাথেই কাম আছিল্। যাউ, চুরুটটা বাইরত যায়া শেষ করি। ভিতরত ধোঁয়া হই যাছে। আবার কখন স্মোক অ্যালার্ম বাজি উঠিবে। অবশ্য সবই টাকা দিয়া ম্যানেজ করা যায়। বুঝলু ইয়ং ম্যান! কোনো নিয়মের তোয়াক্কা আশিস মাইতি করে না।
আশিসবাবু কেবিনের দুয়ার খুলি বাইরত বাহির হই গেইল্। সত্যি কবার গেইলে—এত সিনিয়র লোক, অথচ ভদ্রতার অভাব। কেবিনত যে আরো দুইজন আছে, তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ না করি দিব্যি চুরুট খাছিল্!
অবশ্য তাতে কেবিনের অন্য জনের কোনো অসুবিধা হইছে বুলি মনে হয় না। অন্য পাকে মুখ করি এ্যালাও দিব্যি ঘুমি যাছে। আশিসবাবুক যে ক্যানে এত চেনা লাগিছিল্ মনে করিবার চেষ্টা করিল্ রজত। এত চেনা মুখ। ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ মনে পড়িল্ ক্যানে এত চেনা লাগে। হ্যাঁ, এগজ্যাক্টলি। পরিষ্কার মনে পড়ি গেইছে। কয়েক মাস আগত ‘জয়ন্তী’ পত্রিকাত যে গল্পটা লেখিছিল্, তার সাথত ছবিটা রজতেই আঁকিছিল্। সেই ছবিত গল্পের প্রধান অপরাধী আগরওয়ালের যে ছবি আছিল্, তার সাথত আশিসবাবুর প্রচণ্ড মিল। কিন্তুক আশিসবাবুক তো রজত আগত কখনো দেখে নাই—তাইলে ওই ছবিটা আশিসবাবুর হইল্ ক্যাংকরি? এতটা মিল আপনা থাকি! রজত আরেকটু ভাবিবার চেষ্টা করিল্। ঠিক একেই নাকান—ডাইন গালত জড়ুল। চেপ্টা নাক। চউখত রিমলেস চশমার ভিতর দিয়া একেই নাকান শ্যেনদৃষ্টি। ছবিত লোকটার বয়স অবশ্য কম আছিল্।
আচ্ছা, এইকেই কি ঘুরি-ফিরি সেই ভয়ের স্বপনটাত দেখিত্ রজত! ছোটোবেলা থাকি যে স্বপনটা বারবার ঘুরি-ফিরি আসিত্। এলাও যে দুঃস্বপন দেখি ভয়ে মাঝেমধ্যে জাগি উঠে রজত! সেরকমেই কি দেখিবার এই লোকটাক? ঠিক তাই। স্বপনত যার চেহারা দেখিবার পায়, তারও ডাইন গালত জড়ুল। চউখের নীচটা ঠিক একেই নাকান বসা। চেপ্টা নাক। কী অদ্ভুত কাণ্ড!
কেবিনের দুয়ারটা আবার খুলি গেল্, আশিসবাবু সান্দাইল্। দুয়ার বন্ধ করি নিজের সিটত আসি বসিল্। মিনিটখানেক চুপচাপ। তার পাছত কয়া উঠিল্,—হ্যাঁ, এলায় মনে হইছে রঞ্জনের নামটা শুনিছু। হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকত মরি যায়, তাই না?
—হ্যাঁ, মুই তখন খুব ছোট। বছর দুইয়েক বয়স, বাপের সাথত পার্কত গেইছিলুং। মুই খেলিছু। বাপ পার্কের বেঞ্চত বসিছিল্। ওটেই হার্ট অ্যাটাকত মরি যায়। মুই নাকি বাপক বারবার করি ডাকিছু। বাপ সাড়া দেয় নাই। তাই দেখি আশপাশের মানষিলা আগি আসে। বাপক হাসপাতালত নিয়া যাওয়া হয়, ওটে জানানো হয় বাপ মরি গেইছে। মোর অবশ্য কিছুই মনে নাই।
—কিচ্ছু মনে নাই? কী হইছিল্ হঠাৎ করি? বাপ কি সাহায্য চাহিছিল্?
—না, মোর কিছুই মনে নাই। বাপের চেহারাটাও মোর মনে পড়ে না। বাপের সব স্মৃতি হইল্ এলায় বাপের ছবি। তায় তো সবসময় সাথত বাপের ছবি থুই। এই যে—কয়া মানিব্যাগত থোয়া ছবিটা তুলি ধরে রজত।
—দেখি—কয়া মানিব্যাগটা হাতত ধরি খানিকক্ষণ তাকি রইল্ আশিসবাবু—নাহ, চেহারাটা ঠিক খেয়াল হইছে না।
একটু দ্বিধা করি কথাটা কয়ায় ফেলিল্ রজত—আপনাক মোর শুরু থাকিয়ায় খুব চেনা মনে হইছিল্। মোর একটা গল্পত মোর আঁকা একটা ছবি আছিল্ সাথত থাকিলে দেখাইতুং। ছবিটা হুবহু আপনার নাকান।
—’সে কী!’ নড়ি-চড়ি বসিল্ আশিসবাবু—’খবরের কাগজত মোর ছবি দেখিছিস নাকি?’
—’না, মুইও তাই ভাবিছু। আপনাক তো আগত কখনো দেখি নাই। ছবিটা ঠিক আপনার নাকান হইল্ ক্যাংকরি! পাছত মনে হইল্ মুই একটা স্বপন ছোটোবেলায় খুব দেখিতুং। এলাও মাঝেমধ্যে দেখি। স্বপনটা এই নাকান—একটা লোক বেঞ্চত বসি আছে। হঠাৎ দুইজন লোক তার পাকে আগি আইল্। একজন—তাক দেখিবার ঠিক আপনার নাকান, সে বেঞ্চত বসা লোকটার সাথত কী সব কথা কইল্। এর মাঝত হঠাৎ করি সাথের অন্য লোকটা পাছন থাকি বেঞ্চত বসা লোকটার মুখত রুমাল চাপি ধরিল্।
—তার—তারপর?
—বাকিটা একেকবার একেক নাকান দেখি।
—মোর নাকান দেখিবার লোকটা কী করিল্?—আশিসবাবু উদগ্রীব হই কয়া উঠিল্।
—সেইটা ঠিক বুঝিবার পাই না। কী একটা জিনিস দিয়া যেন বেঞ্চত বসা লোকটার হাতটা চাপি ধরিল্।
—হা: হা:, তাইলে তোর স্বপনত মুই ভিলেন—কী কস?
—এই স্বপনটা ছোটোবেলায় খুব দেখিতুং, এলায় কম দেখি। কিন্তুক এত স্পষ্ট, মাঝেমধ্যে মনে হয় স্বপন নাহায়—সত্যি।
—স্বপন এত বিচিত্র হয়, তবে ওসবের কোনো মাথামুণ্ডু থাকে না। যে ভাল লোক, তাক স্বপনত হয়তো খারাপ দেখি। যত হাবিজাবি। বকোয়াস।
একটু থামি আশিসবাবু ফের কয়া উঠিল্—এসব নিয়া একদম ভাবিস না। এমন ঘুমি নাহায়—জাগি স্বপন দেখিস। মোর নাকান। তা না হইলে বড় হওয়া যায় না। উহ, আইজকা এত মাথা ধরিছে না! কোনো ওষুধও আনি নাই সাথত। আছে তোর কাছত কোনো ওষুধ?
—আপনার কোম্পানিরেই ওষুধ আছে। অ্যাসিবিওন। নিবেন? ওটাত তো মোর বেশ কাম দেয়।
—না, না, অ্যাসিবিওন মোর সুট করে না—দরকার নাই। চুপ করি শুতিলে আপনা থাকিয়ায় মাথাব্যথা ছাড়ি যাইবে।—কয়া আশিসবাবু চাদর-কম্বল পাতি শুতিবার ব্যবস্থা করিবার নাগিল্।
হঠাৎ কাঁয়ো যেন ধমকি উঠিল্—মিছা কথা আশিস! সত্যি কথাটা কম? অ্যাসিবিওন খাইলে কী হয় তা তুই জানিস।
চমকি উঠিল্ রজত। উপরের বাঙ্কের লোকটা উঠি বসিছে। আবছা আলোত মুখ না দেখা গেলেও গলার আওয়াজ ওদি থাকিয়ায় আসছে। রজতের উপরের বাঙ্কত, তায় আশিসবাবুর মুখোমুখি।
ধমক খায়া আশিসবাবুর মুখটা ছাই-ফ্যাকাশে হই গেইছে। কোনোরকমে সিটত পাতা সাদা চাদরের প্রান্ত দুই হাত দিয়া চাপি ধরি বসি আছে। কেমন যেন গুটিয়াই গেইছে ভয়ত।
—ফেজ ফোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, অ্যাসিবিওন ড্রাগ বাজারত ছাড়িবার আগত তার উপর পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। আগের টেস্টগিলা পাস করি গেইছে অ্যাসিবিওন। ফেজ ফোরটা পার হইলেই বাজারত ওই ওষুধ। মোর পথ প্রশস্ত হই যাইবে। ফেজ ফোরত দেখা হয় পেশেন্টগিলার উপর ওষুধের লং টার্ম এফেক্ট। অর্থাৎ ওষুধ খাওয়ার দুই-তিন বছরের মাঝত পেশেন্টের কী হয়! ঠিক এই সোমায় দেখা গেল্ পঞ্চাশ বছর বয়সের বেশি কাঁয়ো ওই ওষুধ খাইলে তার ক্যান্সার হইছে। যে পাঁচজন টেস্ট সাবজেক্টের বয়স পঞ্চাশের বেশি, তারার প্রত্যেকেরেই ক্যান্সার হইছে দুই বছরের মাঝত। অর্থাৎ ওই ওষুধ বাজারত আনা যাইবে না। ঠিক কি না আশিস! আর তায় ঠিক সেই কারণেই তুই নিজে ওই ওষুধ খাস না! ঠিক কিনা!
উপর থাকি গম্ভীর গলা ফের ধমকি কয়া উঠিল্—মুই আছিলুং ওই ওষুধের রিসার্চ সায়েন্টিস্ট। তোর টিমত। তোমরালা ওই তথ্য লুকি ওষুধটা তবুও বাহির করিবার চাইলেন। কোটি টাকার উপরে ওষুধ বানাইতে খরচ হই গেইছে। বাধা হইছিলুং মুই। কোনোরকম কম্প্রোমাইজ করিবার চাই নাই। তায় মোক সরি দিলেন। ছাওয়াক পার্কত বেড়াইতে নিয়া গেছু, তখন প্ল্যান করি খুন করিলেন। ইঞ্জেকশন দিয়া। একবারও ভাবিলেন না ছোট ছাওয়াটার কথা। নেহাত ও দূরত খেলিছিল্, টের পান নাই। তা না হইলে হয়তো ওকোও মারিতেন—তাই না?
আশিসবাবু নড়ছেন না, পাথরের নাকান বসি আছে। আন্ধারত ফের ওই একেই গলায় শোনা গেল্—’নেও, মোর ছাওয়ার হাত থাকি অ্যাসিবিওন খায়া নেও—খাইতে তোমাক হইবেই। কী? ক্যান্সারের এত ভয়? এতদিনে যে লক্ষ লোক মরি গেইছে এ ওষুধ খায়া। তারালা জানেও না এর আসল কারণ। তোমারলার এত পপুলার প্রোডাক্ট, নিজে খাবেন না!’
আবার অট্টহাসি হাসি উঠিল্ বাঙ্কের উপরের যাত্রী—নাহ, আর দরকার নাই দেখেছি। মোর হার্ট অ্যাটাক বুলি কেস সাজাইছিলেন তুই, তোর ক্ষেত্রত উয়ারকম কেস সাজানের দরকার নাই দেখেছি। সত্যিকারের হার্ট অ্যাটাক।
কথাটা থামি গেইল্। বাইরত ট্রেইনের ঝিকঝিক আওয়াজটা যেন বাড়ি গেইছে। দূরত আলোগিলা দুরন্ত বেগে উল্টা পাকে ছুটি যাছে গাছগাছালি সাথত নিয়া। মেঘের সাথত লুকোচুরি খেলিবার থাকা চান্দের আলো-ছায়া হাত বাড়াইছে কামরাতেও। বাইরত সার দেওয়া গাছগিলার ছায়া ছায়া অবয়ব যেন আড়চউখে এই কামরার পাকেই তাকি আছে।
যা হয় হইবে! সমস্ত সাহসত ভর করি উঠি খাড়া হইল্ রজত। উপরের বাঙ্কত আর কাঁয়ো নাই। খালি সামনের নীচের বাঙ্কত পড়ি আছে আশিসবাবুর নিথর দেহা। আর তার পাশত একটা পুরানা ফাইল—’অ্যাসিবিওন প্রজেক্ট রিপোর্ট।’
প্রতিশোধ – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
রাজবংশী ভাষায় অনুবাদ: Bhawaiya Blog
হালিচা:
ভুতের গপ্পো