এথেন্সের শেকলত বান্ধা ভূত – হেমেন্দ্রকুমার রায়

ভেল্লা দিন আগের কথা। তখনও যীশুখৃষ্টের জন্ম হয় নাই। আড়াই কি তিন হাজার বছর হইবে। পুরানা গ্রীসোত এথেন্স কয়া একটা জাগা আছিল। এথেন্স অচিনা নাম নোয়ায়, সগায় ইয়ার নাম শুনিছে। ওই এথেন্সেরই একটা পাহাড় ঘেরা ছোট্ট গাঁওত এক জঙ্গলের ভিতরত পুরানা একটা বাড়ি আছিল। বাড়িটা অবশ্য মেলা দিন ধরি খালি পড়ি আছিল। একে তো নির্জন পাহাড়ি এলাকা। তার উপরত বন-জঙ্গল দিয়া ঘেরা চাইরোপাক। তায় পরিত্যক্ত। মানষিও না থাকিলেও বাড়িটা কিন্তুক খুব একটা ভাঙা-চোরা অবস্থাত আছিল না। মানে ইচ্ছা করিলে সাফ-সুতরা করি বা অল্প সাজেয়া-গুছেয়া নিলে মানষি আরামসে ওটে থাকিবার পারিত। আসলে সগায় কি আর মানষির ভিড় হৈ-হট্টগোলের ভিতরত থাকিবার পছন্দ করে? অনেকে নির্জন শান্ত জাগাত নিজের মতন করি থাকিবার ভালবাসে।

কিন্তুক আশ্চর্যের ব্যাপার ওই বাড়ির যে মালিক ওয় কিন্তুক হাজার চেষ্টা করিয়াও বহুদিন পর্যন্ত কাকো ওই কুঠিটা ভাড়া দিবার পারে নাই। আসলে পাহাড়ের উপরত নির্জন জঙ্গলের ভিতরত থাকা কুঠিটার বেশ বদনাম হয়া গেছিল। একবার এক শান্তিপ্রিয় ভদ্রলোক কুঠিটা দেখি লোভ সামলাবার পারে নাই। উমরা ছুটির সময় কাটাবার তানে ওই নির্জন কুঠিটাক বাছি নিছিলেন কয়দিন শান্তিত কাটাইমেন কয়া। কিন্তুক পরের দিন সকালবেলা দেখা গেইল মানষিটার মরা দেহ পড়ি আছে কুঠির দালানোত। পইলা পইলা ব্যাপারটা নিয়া তেমন কায়ো মাথা ঘামায় নাই। তবে যারা তার মরা দেহ দেখছিল সগারে মনোত কিছু সন্দেহ জমাট বাঁধছিল। কারণ মরার পরেও লোকটার চোখ-মুখোত একটা অস্বাভাবিক ডর নাগি আছিল। আর চোখ দুইটা ঠেলি বাহির হয়া আসছিল। কিন্তুক, পাছত, মানে বেশ কিছুদিন পর আর একজন সৈনিক নাকান লোক ওই বাড়িত আসছিল রাইত কাটাবার : লোকটা আছিল অসম্ভব সাহসী। ওই লোকটা পরানত মরে নাই ঠিকই, কিন্তুক তার মুখ থাকি রাইতের অভিজ্ঞতা যা শোনা গেইছিল তা আছিল রীতিমত ডরানিয়া। খাওয়া-দাওয়া সারি রাইতোত সবে ওয় শুতিবার গেইছিল এমন সময় ওয় হঠাৎ দেখিবার পাইল ছাই-রঙের দাড়িওয়ালা বিরাট চেহারার এক বুড়া হাত-পাওত শেকল নাগানো অবস্থাত ঘুমন্ত সৈনিকের আগোত আসি খাড়া হইছিল। তার মুখ থাকি কেমন এক নাকান গোঁ গোঁ আওয়াজ বাইরাবার নাগছিল। সৈনিক পুরুষটা মরে নাই। কিন্তুক বেহুঁশ হয়া গেইছিল। পরের দিন হুঁশ ফিরি আসার সাথে সাথে ওয় ওই কুঠি ছাড়ি পালেয়া আসছিল। সৈনিকটার মুখে সব কথা শুনার পর সারা গাঁওত আতঙ্ক ছড়ি পড়িল। এমন কি দিনের বেলাতেও আর কোন সাহসী লোক ওই বাড়ির পাকে পাও বাড়াইত না। লোকের মুখে কথাটা ছড়ি পড়ার পরই ভূতের বাড়ি কয়া কুঠিটার অপবাদ হয়া গেইল। কায়ো আর সাহস করি ওই কুঠির ত্রিসীমানাত পাও বাড়াইত না। কুঠির মালিক যে আছিল ওই লোকটা কুঠিটা ভাড়া দিয়া নিজের সংসার চালাইত। কিন্তুক যে মুহূর্তোত ওই নাকান একটা ভূতুড়িয়া কথা ছড়ি পড়িল তারপর থাকি আর কায়োই কুঠিটা ভাড়া নিয়া কয়দিন থাকার কথা ভাবিবারও পারিত না। ফলে হইল কি কুঠিটা সগার কাছে ‘ভূতকুঠি’ নামে চিনা হয়া গেইল। কায় বা সাধ করি নিজের পরান বিসর্জন দিবার যাইবে? শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়াই পানির দরোত কুঠিটা বেচি দিবার চাইল কুঠির মালিক। কিন্তুক কিনিবে কায়? সখ করি ভূতের হাতোত পরান খোয়াইতে কায়ো রাজি নোয়ায়।

তাও একজন রাজি হইল। কুঠির মালিক একজন খদ্দের পাইলেন। লোকটা আছিলেন তখনকার দিনোত একজন নামকরা দার্শনিক। দার্শনিক মানষিরা সাধারণত নির্জন জাগাত থাকিবারই ভালবাসেন। উনি যুক্তি আর তর্ক দিয়াই সব কিছু বিচার বা বিশ্লেষণ করিবার ভালবাসেন। লোকের মুখে কুঠিটার অপবাদের কথা উমারও কানোত আসছিল। কিন্তুক দার্শনিক ভদ্রলোক মন-পরান দিয়া কোন অলৌকিক ব্যাপার বিশ্বাস করিবার চাইতেন না। উনি ভাবিলেন বাড়িটাত যায়া উনি উঠিবেন। মানষির ভিতরত ভূতের ডরের অযৌক্তিক সংস্কারক উড়েয়া দিবার চাইলেন। কুঠির মালিকের কাছে যায়া উনি কুঠিটা কিনার বাসনা জানাইলেন। মালিক তো হাতোত স্বর্গ পাইলেন। উনি ধরিয়াই নিছিলেন এমন ভুতুড়িয়া বাড়ি কোনদিনও ভাড়া বা বিক্রি হবি না। সেইতানে দার্শনিক ভদ্রলোকের প্রস্তাব শুনি মালিক আকাশ থাকি পড়িলেন। কয় কি এই বুড়া, ভাড়া নোয়ায় একেবারে কিনিবার চাইছেন? অত্যন্ত কম দামোত উনি সাথে সাথে কুঠিটা বেচি দিয়া হাঁফ ছাড়িলেন।

আগোতেই কইছি যুক্তি ছাড়া দার্শনিক চলেন না। যা চোখে দেখা যায় না, হাত দিয়া যাক ছোঁয়া যায় না অথবা অন্তর দিয়া যাক উপলব্ধি করা যায় না ওমন কিছুতে উমার বিশ্বাস আসিবে ক্যাংকা?

নিজের সব জিনিসপত্তর নিয়া যায়া উঠিলেন সদ্য কিনা ওই বাড়িটাত। সারা দিন ধরি নিজের হাতে সব কিছু সাজাইলেন। নিজের হাতেই তাঁক সব কিছু করিবার নাগছিল, তার কারণ বাড়িটার ভুতুড়িয়া কান্ডকারখানা নিয়া এমন সব গল্পগুজব বানাইছিল যে উনি অনেক বেশি পয়সার লোভ দেখেয়াও কোন চাকর-বাকর পান নাই।

যাইহোক, সারাদিন খাটনির পর দার্শনিক ভদ্রলোক বেশ ক্লান্ত হয়া পড়ছিলেন। খুব একটা খাওয়া-দাওয়ার ইচ্ছেও আছিল না। অল্প রুটি মাংস আর কফি দিয়া রাইতের আহার শেষ করিলেন। তারপর যায়া শুইলেন উমার ছোট্ট বিছানাত। মাথার কাছে বিরাট সেকেলে নাকান একটা জানালা আছিল। ওটাও খুলি থুইলেন। গরমের দিন। সাঁঝ রাইতের ফুরফুরা বাতাস বইছিল। দেহোতও আছিল অত্যন্ত ক্লান্তি। বাতি নিবেয়া শোবার সাথে সাথে দুই চোখের পাতাত নামি আইল রাজ্যের ঘুম।

কতক্ষণ ঘুমেয়া আছিলেন কায় জানে! হঠাৎ একটা অদ্ভুত আওয়াজ আর অস্বস্তির ভিতরত উমার ঘুমটা ভাঙি গেল। গভীর ঘুমোত ডুবি থাকা মানষির হঠাৎ ঘুম ভাঙি গেলে অল্প সময় নাগে ঠিক হবার। দার্শনিক ভদ্রলোকেরও অল্প সময় নাগিল উনি কোটে আছেন, কেমন করি আছেন এইটুক বুঝিবার। তারপর উমার সব কিছু একে একে মনে পড়ি গেল। উমার মনে পড়িল উনি আসছেন এক নয়া বাড়িত। আর এই নয়া বাড়িতেই উমার পইলা রাইত থাকা। কান খাড়া করি অদ্ভুত আওয়াজ আর অস্বস্তিটা উনি বুঝিবার চেষ্টা করিবার চাইলেন। মিনিট দুই-তিন মড়ার নাকান বিছানাত শুতি থাকি উনি বুঝিলেন আওয়াজটা অনেকটা শেকলের ঝনঝন আওয়াজের নাকান। কিন্তুক খুব স্পষ্ট নোয়ায়। কায় যেন বহুত দূর থাকি শেকল টানি টানি আসিবার নাগছে। আস্তে আস্তে চোখ মেলি তাকাইলেন। জমাট আন্ধার সারা ঘরোত ছড়েয়া আছে। মাথার কাছে জানালা দিয়া খালি আকাশটুক দেখা যায়। অবশ্য ওই সময় আকাশটাক আলাদা করি চিনা যাবার নাগছিল না। আকাশের রঙ আর ঘরের রঙ এক হয়া গেইছিল। দার্শনিক ভদ্রলোক কিন্তুক চট করি বিছানা ছাড়ি উঠি বসিলেন না। উনি লক্ষ্য করিবার চাইলেন ব্যাপারটা কি? আরও একটা জিনিস উনি অনুভব করিলেন। গোটা ঘরের বাতাস যেন থমকি আছে। একটা দম বন্ধ করা গুমোট পরিবেশ বানাইছে।

অনেকটা সময় যখন এই নাকান করি কাটি গেল, আর জমাট বাঁধা আন্ধারটা যখন আস্তে আস্তে সহি আইল, হঠাৎই উনি আবিষ্কার করিলেন হাত-পাওত শেকল বাঁধা একটা অশরীরীর হালকা ছায়া মূর্তি আস্তে আস্তে ভাসি উঠিবার নাগছে। হাত নাড়ি ওই ছায়ামূর্তিটা কি যেন কবার চাইছে। মূর্তিটার দুইটা চোখ আর মুখের হাঁ থাকি জ্বলন্ত আগুনের আভা ঠিকরি বাইরাবার নাগছে।

দার্শনিক ভদ্রলোক আছিলেন প্রচন্ড সাহসী। ভৌতিক কিছুতে উমার তেমন বিশ্বাস বা সংস্কার কিছুই আছিল না। তাও, ডর না পাইলেও, একটা অদ্ভুত বিস্ময় তাঁক কিছুক্ষণের তানে আচ্ছন্ন করি থুইল।

উনি বুঝিবার চাইলেন, এইটা কি? কোন ডরানিয়া দানব নাকি কোন অসৎ মানষি ওই নাকান সাজগোজ করি তাঁক ডর দেখাবার চাইছে?

শুতি শুতি এইসব নানান যুক্তি-তর্ক যখন উমার মনোত ঝড় তুলিছে তখনই উনি দেখিলেন ওই হাত-পাওত শেকল পরা ছায়া ছায়া মূর্তিটা আস্তে আস্তে উমারই পাকে আগেয়া আসিবার নাগছে। শেষ পর্যন্ত মূর্তিটা উমার একেবারে খাটের কাছে আসি থমকি খাড়াইল। দুই চোখ আর মুখের গর্ত থাকি তখনও ওই লাল আগুনের আভাটা ঠিকরি পড়িবার নাগছিল। ওয় যেন মুখ হাঁ করি হাত-পাও নাড়ি কিছু একটা কবার চাইছিল। আর তার হাত নাড়ার সাথে সাথে শেকলের ঝনঝন আওয়াজটাও এক নাগাড়ে শব্দ তুলি যাবার নাগছিল। অন্য কায়ো হইলে এতক্ষণে নিশ্চয় বেহুঁশ হয়া যাইত অথবা দুর্বল কলজার কোন রুগী হইলে নির্ঘাৎ তার মরণ হইত। কিন্তুক অত্যন্ত সাহসী ওই দার্শনিক ভদ্রলোকটার কিছুই হইল না। বরং উনি যেমন আছিলেন ওই নাকান করিয়াই তাকেয়া রইলেন ছায়ামূর্তিটার পাকে। আসলে উনি দেখিবার চাইছিলেন অশরীরী মূর্তিটা এরপর কি করে?

এক মুখ দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, আর এক মাথা রুক্ষ চুলে মূর্তিটাক তখন বেশ বীভৎস আর ডরানিয়া মনে হইবার নাগছিল। তার উপরত তার হাতের নখগিলা আছিল বেশ বড় বড়। হাতের তীক্ষ্ণ আর বড় বড় নখ দেখি দার্শনিকের মনোত একটা অন্য নাকান ডর আইল। ভূত উনি বিশ্বাস করিতেন না। কিন্তুক জ্যান্ত দেহের কোন চোর-ডাকাতক উমার ডর না করার কোন কারণ আছিল না। মরার পর প্রেতাত্মা মানষির কতটা ক্ষতি করিবার পারে সে সম্বন্ধে উমার কোন ধারণাই আছিল না। না-দেখা এমন কিছু পৃথিবীতে আছে বলিয়াও উমার বিশ্বাস আছিল না। কিন্তুক জ্যান্ত চোর-ডাকাত মানষির অনেক ক্ষতি করিবার পারে। তাছাড়া উমার কাছে আত্মরক্ষার নাকান তেমন কোন অস্ত্রই আছিল না। মনে মনে যখন উনি ভাবিবার নাগছিলেন সত্যিই যদি লোকটা কোন চোর-ডাকাত হয় তাইলে উমার করার কিছু থাকিবে না। তার উপরত লোকটাক দেখি মনে হয় তার গাওত বেশ জোরও আছে। সেইতানে উনি যখন সম্ভাব্য বিপদের হাত থাকি বাঁচিবার তানে কি করা যায় তাই ভাবিবার নাগছিলেন, ঠিক ওই মুহূর্তোত আশ্চর্য হয়া লক্ষ্য করিলেন মূর্তিটা আর এক পাওও না আগেয়া আসি খালি পাছু হঠিবার শুরু করিল। পিছাইতে পিছাইতে ওয় একসময় ঘর ছাড়ি দিল।

অশরীরী মূর্তিটাক পিছেয়া যাবার দেখি দার্শনিক ভদ্রলোকটা ক্ষণিকের অবশ অবস্থা ছাড়ি তড়াক করি বিছানা ছাড়ি উঠি পড়িলেন। তারপর নিজেও দৌড়ি ঘর ছাড়ি বাহিরোত আসি খাড়া হইলেন।

অশরীরী মূর্তিটা ভূত বা অদ্ভুত যাই হউক না ক্যাংকা দার্শনিক পরম বিস্ময়োত লক্ষ্য করিলেন বারান্দা পার হয়া মূর্তিটা আস্তে আস্তে নিচে নামি গেল। তারপর লম্বা উঠানের ঠিক মাঝ বরাবর যায়া হঠাৎই যেন কর্পূরের নাকান উধাও হয়া গেল। দার্শনিক ঠিক তখনই একবার চিকরি উঠিলেন ‘কায় কায়’ কয়া। কিন্তুক উত্তরোত খালি বহুত দূর থাকি ভাসি আসা অস্পষ্ট গোঙানি ছাড়া আর কিছুই শুনিবার পাইলেন না।

উঠানের ঠিক যে জাগাত মূর্তিটা অদৃশ্য হয়া গেইছিল ওইটে খাড়া হয়া অনেকক্ষণ গুম হয়া কি যেন ভাবিলেন। আরো দু-একবার ডাকাডাকি করিয়াও কারো উত্তর কিছু পাইলেন না। বিফল মনোরথে উনি ঘরত ফিরি শুতি পড়িলেন। বাকি রাইতটা এই অদ্ভুত ব্যাপারটা নিয়া চিন্তা করি করি কাটেয়া দিলেন।

ভোরের আলো ফুটার সাথে সাথে গত রাইতোত ঠিক যে জাগা থাকি মূর্তিটা অদৃশ্য হয়া গেইছিল ওটে আসি অনেক কিছু পর্যবেক্ষণের চোখে খুঁটিয়া খুঁটিয়া লক্ষ্য করিবার নাগিলেন। কিন্তুক দিনের আলোত কোন কিছুই উমার অস্বাভাবিক কয়া মনে হইল না।

পাহাড়ের টিলাত এই বাড়িটা আছিল লোকালয় থাকি বেশ কিছু দূরোত। লোকজন কায়ো তেমন থাকিত না। হয়ত ওটা কুঠি বাড়িক কেন্দ্র করি যে সব গল্প আর গুজব আছে তারই ডরে কোন সাহসী পুরুষও এই বাড়ির ত্রিসীমানাত আসিত না।

নির্বান্ধব আর নির্জন বাড়িটাত দার্শনিক আবার তন্ময় হয়া গেলেন উমার নিজের কামোত। নিজের চিন্তাত। নিজের পড়াশুনাত। প্রায় সারাদিনই উনি বইয়ের জগতোত ডুবি রইলেন। ফলে রাইতের ওই অশরীরী আর অদ্ভুত ঘটনার কথা উনি প্রায় ভুলিয়াই গেইছিলেন। রাইতের খাওয়া-দাওয়া সারি যখন উনি বিছানাত শুতিবার গেলেন তখনই একবার গত রাইতের কথা মনে আইল। কিন্তুক ঘটনাটাক উনি তেমন আমল দিলেন না। ভাবিলেন অত্যধিক চিন্তাগ্রস্ত থাকার তানে আধা ঘুম আধা জাগরণে কি দেখিবার কি দেখছিলেন। বিছানাত শোবার সাথে সাথে ঘুম না আইলেও কিছুক্ষণের ভিতরতই উনি গভীর ঘুমোত ডুবি পড়িলেন।

ডর-ভয় না থাকার তানে সব কিছুক অলীক কয়া উড়েয়া দিলেও পরের রাইতোত কিন্তুক ওই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিল। তার পরের রাইতোতও ওই একই ব্যাপার। পর পর তিন রাইত একই নাকান করি অশরীরী মূর্তির আবির্ভাব আর একই নাকান করি হাত নাড়ি কিছু কবার চাওয়ার চেষ্টা আর একই নাকান করি উঠানের ঠিক একই জাগাত আসি মিলেয়া যাওয়া, তাঁক বেশ ভাবেয়া তুলিল। উনি কিছুতেই কোন ব্যাখ্যা দিয়াই বুঝিবার পারিবার নাগছিলেন না এইটা কেমন করি হয়? কিভাবে হয়? তবে কি এইটা নয়া নাকান যাদুবিদ্যা? অবশেষে চতুর্থ দিন সকালবেলা দার্শনিক কিন্তুক আর নিছকই কল্পনা কয়া সব কিছু উড়েয়া দিবার পাইলেন না। আবার ডর পেয়া বাড়ি ছাড়ি পালেয়াও গেলেন না। উনি মনে মনে ভাবিলেন নিশ্চয় এর ভিতরত কিছু অনুসন্ধানের আছে। নিছক মায়া বা যাদুবিদ্যা নোয়ায়। আর সত্যিই যদি অশরীরী কোন প্রেত হয়া থাকে তাইলে নিশ্চয় ওয় কিছু কবার চাইছে। আর সব থাকি দার্শনিকক বেশি আকৃষ্ট করিল উঠানের ওই নির্দিষ্ট জাগাটা। ক্যাংকা করি প্রতি রাইতোত অদ্ভুত আর বীভৎস আকৃতির ওই মূর্তি ওই বিশেষ একটা জাগাত আসি হারেয়া যাবার নাগছে। তাইলে কি ওই জাগাটোতেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কিছু লুকেয়া আছে? এর একটা বিশেষ তদন্ত হওয়ার প্রয়োজন।

চতুর্থ দিন সকালবেলা আলো ফুটার সাথে সাথে দার্শনিক আর বাড়িত বসি রইলেন না। চলি গেলেন শহরোত। পইলাতেই উনি যোগাযোগ করিলেন স্থানীয় ম্যাজিষ্ট্রেটের সাথে। সব কথা তাঁক খুলি কইলেন। অন্য কায়ো হইলে হয়ত পাগলের খেয়াল ভাবি ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব উড়েয়া দিতেন। কিন্তুক এই দার্শনিক আছিলেন বেশ নামী লোক। জ্ঞানী আর বুদ্ধিমান হিসেবে উনি প্রায় সগারই চিনা। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের নাকান একজন গণ্যমান্য লোকের সাথে যে উনি মস্করা করিবেন না এইটা ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব নিজেও জানিতেন। কালবিলম্ব না করি উনি বেশ কিছু মজুর নিয়া ফিরি আইলেন দার্শনিকের কিনা নয়া বাড়িত। উঠানের ঠিক যে জাগাত আসি অশরীরী মূর্তিটা গত তিন রাইতোত অদৃশ্য হয়া যাইত ওই জাগাত মাটি খোঁড়া শুরু হইল। অবশ্য বেশি দূর খুঁড়িবার নাগিল না। অল্প কয়েক হাত মাটির তলেই পাওয়া গেল একটা সম্পূর্ণ কঙ্কাল। কঙ্কালটার হাত-পাও শিকল দিয়া বাঁধা। শিকলোত মরচা ধরিছে বেশ পুরু হয়া।

প্রেত বা ভূত কোনদিনও বিশ্বাস আছিল না দার্শনিক ভদ্রলোকটার। কিন্তুক গত তিন রাইত ধরি শিকল-বাঁধা একটা মূর্তির সাথে শিকল-বাঁধা কঙ্কালটার কোটে যেন কি সাদৃশ্য আছে। এইটা অনুমান করিবার তার কোন অসুবিধা হইল না। সহজ আর যুক্তিগ্রাহ্য বুদ্ধি দিয়া দার্শনিক এর কোন অর্থই করিবার পাইলেন না।

ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেবের পরামর্শে নিয়মকানুন মানি উমারা কঙ্কালটা যথাযথভাবে কবর দিলেন। আর সব থাকি অদ্ভূত ব্যাপার যা, তা হইল কঙ্কালটা ভাল নাকান করি কবরস্থ হবার পর আর কিন্তুক কোনদিনও কোন রাইতেই দার্শনিকের ঘরোত ওই অশরীরী মূর্তির আবির্ভাব ঘটে নাই।

এরপর দার্শনিক বহুদিন ওই বাড়িত বাস করিছিলেন। বহুদিন ধরি উনি কবরস্থ কঙ্কালটার সম্বন্ধে খোঁজ-খবরও করিছিলেন। কিন্তুক সঠিকভাবে কায়ো কবার পারে নাই ওই বাড়িত কাকো কোনদিনও কবর দেওয়া হইছিল কি না। তবে ওই গাঁওয়ের এক অতি বুড়ার মুখে শোনা যাইত, অনেক অনেকদিন আগোত এক বুড়া কৃতদাসক সামান্য অপরাধের তানে ওই নাকান করি হাত-পাওত শেকল বাঁধি জ্যান্ত কবর দেওয়া হইছিল। এই ঘটনা সত্য কি মিথ্যা তা জানার উপায় নাই। তবে দার্শনিক এইটুক বুঝছিলেন মরার পর আত্মার আসা-যাওয়া থাকে। আর ওই আত্মা যদি অতৃপ্ত হয় তাইলে অশরীরী রূপ নিয়া মানষিক দেখা দিবার চায়। হয়ত বা তার অতৃপ্ত আত্মার তৃপ্তির পথ খোঁজে।


এথেন্সের শেকলত বান্ধা ভূত – হেমেন্দ্রকুমার রায়
বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ

Post a Comment

Previous Post Next Post