বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত

ভবতারণ বাবু সেদিন কইল - ভূতগিলা সউগ পারে মশাই।

- কেনং করি?
- কোনো এক জাগাত থিতু হয়া বসির পারে। আবার যেইঠে মন যায় ঘুরি বেড়াবারও পারে।
- কেনং করি?
- কোনো গাছত বা পোড়া বাড়িত আস্তানা গাড়ি থিতু হয়া বসির পারে আবার বাউদিয়া হয়া নানান জাগাত ঘুরি বেড়াবার পারে।

রামকানাই বাবু ভবতারণ বাবুর কোনো কাথাই বিশ্বাস করে না। আড়ালে-আবডালে হামার কাছত ফিসফিসেয়া কয় - মানষিটা মহা গুলবাজ, যা কয় তার সেন্ট পারসেন্ট-ই গুল। হামার এই মজারু ক্লাব থাকি ভবতারণ বাবুক গুল সম্রাট নাম দেওয়া উচিত।

ভবতারণ বাবু সেদিন খেয়াল করে নাই যে, আসরের এক কোনাত সয়ং রামকানাই বাবু বসি আছিল; অয় অবশ্য নিজে তাস খেলাছিল না। আর দুই দলের ব্রিজ খেলা দেখছিল।

ভবতারণ বাবুর বাউদিয়া ভূতের কাথাটা খট করি রামকানাই বাবুর কানত বাজিল, তাই অয় চট করি ভবতারণ বাবুর কাছত আসি সুধাইল - ভূত আবার বাউদিয়া হয় নাকি মশাই?

ভবতারণ বাবু গম্ভীর হয়া কইল - হয়, হয় বইকি।

- আপনে কি কখনো বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত পড়ছেন নাকি?
- মুই পড়ির যাম কোন দুঃখত?
- তেবে?
- মোর মাসতুতো ভাইয়ের পিসতুতো মামা খিব নামকরা লেখক।
- মানে লেখক হিসেবে অয় বোধয় কোনো বাউদিয়া ভূতের গল্প লেখছে।
- না, মশাই না। বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত তো পড়েন নাই কখনো - পড়িলে বুঝিলেন হয় কত ধানে কত চাউল!
- তোমার অই মাসতুতো ভাইয়ের পিসতুতো মামা বোধয় বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত পড়ছিল?
- নিচ্চয়। অই বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত পড়িয়ায় উয়ার জীবনটা বরবাদ হই গেইল মশাই।
- কেনং করি?
- উয়ার যা শিক্ষা-দীক্ষা বা যোগ্যতা আছিল, তাতে অয় বিয়া-শাদি করি বড় চাকরি করি আরামে দিন কাটাবার পাইতো, কিন্তুক কি কুক্ষণে যে এম.এ. পরীক্ষা দিয়া বাইরে বেড়াবার গেইল - আর বাইরে যাই পড়িল তো পড়িল একেবারে এক বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত।
- তার পাছত?
- তার পাছত আর কি, অই বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত পড়ি বিয়া-শাদি, চাকরি-বাকরি, সংসার-ধম্ম সউগ মাথাত উঠিল মশাই।
ঘন্টু বাবু অবাক হয়া কইল - কন কি!
- তেবে আর কি কইম, সেই থাকি কম্বল-সম্বল নিয়া ঘুরি বেড়াবার ধইল্লেক, আইজ এইঠে কাইল ওইঠে।
- এইলা কাথা আপনে কার কাছত শুনলেন?
- অই ভদ্রলোকের মাওয়ের কাছত, ভদ্রমহিলা মোর কাছত দুঃখ করি সউগ কাথা কইছিল।
- এলা পর্যন্ত অয় অই বাউদিয়া ভূতের খপ্পর থাকি ছাড়া পায় নাই?
- পাইছে, কিন্তুক এই ষাইট বছর বয়সত, এলা আর জীবনের কি দাম আছে? দুই-চাইরখান বই লেখি নাম করিছে মাত্তর।
- তা ঠিক কইছেন।

রামকানাই বাবু এইবার আসরের মাঝত আসি ভবতারণ বাবুক কইল - শোনেন মশাই, ভূত-টুত বলি কিছু নাই। তার উপরা আবার গুল ঝাড়েছেন বাউদিয়া ভূত, আর সেই ভূতক চাপেয়া দিলেন ভাইয়ের পিসতুতো দাদার কান্ধত। বয়স তো হইল - এই নাখান গুল মারি মারি আর কত দূর যাবেন মশাই?

গোবর্ধন বাবু এতক্ষণ ভিজা বিলাইয়ের নাখান ভবতারণ বাবুর কাথাগিলা চুপচাপ শুনছিল, অয়ও এইবার রামকানাই বাবুর কাথার জের টানি কইল - বয়স তো তিন কাল যাই এক কালত ঠেকিছে, গুল মারার একটা সীমা রাখেন মশাই, সউগ জাগাত খাপ খোলা কি ঠিক?

এমনকি ভুষিমালের ব্যাপারী তোতারাম বাবু পর্যন্ত ভবতারণ বাবুক এক হাত নিল - মুই মশাই মুখ্যু-সুখ্যু মানষি, মোক গুল দিয়া পার পায়া গেছেন, তাই বলি এইঠে গুল মারির আইলেন কোন সাহসে? বিশেষ করি রামকানাই বাবু যেইঠে উপস্থিত আছে, ওইঠে আসি গুল মারা তোমার একদম ঠিক হয় নাই।

এত মানষির আক্রমণত ভবতারণ বাবু প্রথমে কাবু হইলেও শেষত তড়াক করি লাফি উঠি কইল - মুই প্রমাণ করি ছাড়িম, সউগার মুখ বন্ধ করি ছাড়িম, অই ভ্রমণ-সাহিত্যের লেখকক মুই এই রবিবার-ই কোলকাতা থাকি গাড়ি করি নিয়া আসিম আর মুই প্রমাণ করি ছাড়িম - মোর কাথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি - আই টেক ইট এ চ্যালেঞ্জ।

তোমরা রবিবার বিকাল চাইরটা থাকি ছয়টার মইধ্যে সউগে এই মজারু ক্লাবত থাকিবেন। দেখিম কার পাণ্ডিত্য কত দূর!

ভবতারণ বাবু সেদিন আর খেলাইল না। পাম্প-শু পাওত গলেয়া গটগট করি চলি গেইল।

মজারু ক্লাবের সেক্রেটারি বিপদতারণ চৌধুরী মশাই কইল - সউগে মিলি এই নাখান আক্রমণ করি ভবতারণ বাবুক উত্তেজিত করা মোটেও ঠিক হয় নাই। এমনিতেই ব্লাড পেশারের রুগী, শেষত হিতে বিপরীত না হয়।

আক্রমণটা যে মাত্রা ছাড়েয়া গেইছিল, এই কাথা সউগে মানি নিল। ভবতারণ বাবু না হয় একটু গুল-গপ্পো করিয়ায় থাকে - তাই বলি উয়ার উপরা এই নাখান চাপ দেওয়াটা মোটেও ঠিক হয় নাই। ঘটনাটা বুধবার ঘটিলেও শনিবার পর্যন্ত ভবতারণ বাবুক তাসের আসরত দেখা গেইল না।

রবিবার দিন মজারু ক্লাবের প্রায় সউগ সদস্যই উপস্থিত।

ঠিক কাঁটায় কাঁটায় চাইরটার সময় মজারু ক্লাবের সামনত একটা ছাই রঙের অ্যামবাসেডর গাড়ি আসি দাঁড়াইল।

গাড়ি থাকি নামিল ভবতারণ বাবু আর এই কালের নামকরা ভ্রমণ কাহিনীর লেখক দিব্যেন্দু সান্যাল। ক্লাবের সদস্যগিলা কায়ো ভাবে নাই যে ব্যাপারটা এত দূর গড়াবে। এমনকি রামকানাই বাবুও ভাবে নাই যে, ভবতারণ বাবু সচায় দিব্যেন্দু সান্যালক হামার মজারু ক্লাবত নিয়া আসিবে।

মজারু ক্লাব কোনো রেজিস্টারি করা ক্লাব না হয়। বলির গেলে কোনো ক্লাবের আওতাত-ই পড়ে না। একদল রিটেয়ার আধাবুড়ার সময় কাটে না, তাই সময় কাটাবার বাদে হিরণ্যাক্ষ বাবুর বইঠকখানাটা দখল করি তাস খেলেয়া নিয়া মজারু ক্লাবের পত্তন। চা-সিঙাড়া আর তাস খেলার বাদে কিছু তো রোজ খরচ হয়-ই, এর বাদে মাসে পাঁচ টাকা করি চাঁদার ব্যবস্থা।

চাঁদা ঠিক-ই উঠি যায়, মাঝে মাঝে ভুষিমালের ব্যাপারী তোতারাম দুই-একশো টাকা দেয় - তাই আর কায়ো চাঁদা দিল কি না দিল, এ নিয়া খুব একটা ভাবির নাগে না। এমন একটা ক্লাবত যে ভবতারণ বাবু নামকরা একজন সাহিত্যিকক সচায় নিয়া আসিবে, এইটা কায়ো ভাবে নাই।

তাই সউগ সদস্য মিলি অভ্যর্থনা করি সান্যাল মশাইক ভিতরত নিয়া আইল। মাননীয় অতিথি আসিছে বলি তাস খেলাও বন্ধ রাখা হইল।

ভবতারণ বাবু গোঁফত তা দিয়া টেকো রামকানাই বাবুক ফিসফিসেয়া কইল - খুব তো সেদিন ঠাট্টা করছিলেন মশাই, এইবার উয়ার মুখত-ই সত্যিকারের বাউদিয়া ভূতের কাথা শুনির পাবেন। মুই যে গুল মারো না, তারও প্রমাণ পাবেন।

তোতারাম বাবু নিজে গাড়ি হাঁকেয়া বাজারের সেরা মিঠাইয়ের দোকান থাকি নিমকি, সিঙাড়া, খাস্তা কচুরি আর নানান মিঠাই নিয়া আইল - মাননীয় অতিথির বাদে।

দিব্যেন্দু সান্যাল মশাই কইল - এত দূরত তোমারগিলার এই ক্লাবত মুই আসলুং হয় না, কিন্তুক ভবতারণ বাবু খিব অপমানিত হইছে। ভবতারণ বাবুর সম্মান রাখির বাদে মুই তোমারগিলার এইঠে হাজির হইছুং। কারণ তোমরা ম্যালা মানষি ভূতের অস্তিত্ব মানেন-ই না, আর বাউদিয়া ভূতের কাথা শুনি ম্যালা মানষি ব্যাপারটা হাসি উড়েয়া দিছেন - এইলা ভবতারণ বাবুর মুখত-ই শোনা।

রামকানাই বাবু ঝিৎ করি থাকার মানষি না হয়, এতক্ষণ যে কেনং করি ঝিৎ করি আছিল কায় জানে? এইবার অয়-ই মুখ খুলিল - স্যার, আপনে কি নিজে বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত পড়ছিলেন?

- হ্যাঁ।
- কিন্তুক তোমার লেখা কোনো ভ্রমণ কাহিনীত-ই তো সেই কাথা কোথাও লেখা নাই।
- শোনেন, অসম্ভব কাথা সউগ সময় সউগার কাছত কওয়া যায় না। মুই দেখছি শিলা জলত ভাসিছে - সেই কাথা যদি কাওক হঠাৎ কও, কায়ো কি বিশ্বাস করিবে? আজগুবি বা অসম্ভব বলি সউগে উড়েয়া দিবে। তাই বইত এইলা কাথা লেখো নাই। ভবতারণ বাবু অপমানিত না হইলে হয়তো এই কাথা কাওক-ই কইলুং না হয়। কিন্তুক আইজ কছুং - মুই খালি বাউদিয়া ভূতের পাল্লাত-ই পড়ো নাই - ম্যালা দিন সেই বাউদিয়া ভূতের সাথে কাটাইছুং।

তোতারাম বাবু কইল - হামরা সেই কাথা-ই তোমার মুখত শুনির চাই, স্যার।

- কম বলি-ই তো আইজ তোমারগিলার সামনত হাজির হইছুং।

এম.এ. পরীক্ষা দিয়া ভাবিনুং, একবার পিসির বাড়ি বোম্বাই থাকি ঘুরি আসি, তাই টিকিট কাটি বোম্বাই মেলে রওনা দেনুং। সেকেন্ড ক্লাস-এ যাছিনুং। একটা ছোট সুটকেস, সতরঞ্চি আর কম্বল নিয়া।

মুই চিরকাল-ই ঘরকুনো, এর আগত কখনো কোলকাতার বাইরে পাও বাড়াও নাই - হাওড়া বা শিয়ালদা থাকি কোনো ট্রেন-এ চড়ো নাই।

তাছাড়া মুই খিব ঘুমকাতুরেও আছিনুং, যেইঠে-সেইঠে যখন-তখন ঘুমেয়া পড়ির পানুং।

তাই হাওড়া থাকি ট্রেনত চড়ি-ই ঘুমেয়া পড়িনুং। ট্রেনের নড়া-চড়াত ম্যালা মানষির নাকি ঘুম হয় না - মোর কিন্তুক ট্রেনত চড়ি আর ট্রেনের দোলানির বাদে ঘুম আরো বেশি গাঢ় হইছিল।

কিন্তুক পরদিন সকালে উঠি দেখো মোর কিছু নাই - টিকিট নাই, মানিব্যাগ নাই - এমনকি সুটকেসটাও নাই। সহযাত্রী কায়ো কোন স্টেশনত নামি গেইছে - মোক একদম ফকির বানেয়া নামি গেইছে।

পিন্ধনে আছিল ধুতি, গাওত ফতুয়া - আর শুতি আছিনুং কম্বলের উপরা, ওমরা দয়া করি কম্বলখান নিয়া যায় নাই।

বলির গেলে মুই একেবারে নিঃস্ব আর রিক্ত হই গেনুং, হাতের ঘড়িটাও নিয়া গেইছে।

নাগপুর স্টেশনত নামি রিপোর্ট-ও করিনুং না, ভাবিনুং এই নাখান করি বোম্বাই পৌঁছাবার পাইলে হয়, তার পাছত হাঁটি হাঁটি পিসির বাড়ি চলি যাম।

কিন্তুক তার আগ-ই ‘বদনারে’ বলি একটা স্টেশনত এক চেকারের হাতত ধরা পড়িনুং। যারা হাওড়া থাকি মোর সাথে উঠছিল ওমরা সউগে নাগপুরত নামি গেইছে, নাগপুর থাকি আবার নয়া যাত্রী উঠছে - ওমার ধারণা মুই কম্বল-সম্বল নিয়া-ই কোলকাতা থাকি রওনা দিছুং।

মোর দুর্ভাগ্য কওয়া লাগে - কোলকাতা থাকি ম্যালা মানষি সোজা বোম্বাই যায়, কিন্তুক মুই যে কামরাত উঠছিনুং - সেই কামরাত হাওড়া থাকি যে কয়জন উঠছিল ওমার শেষ জন নাগপুর-ই নামি গেইছে, যাবার সময় অবশ্য দয়া করি কইছে - ভাইসাব, আপ মেরা নাগপুর কা কোঠি মে চলিয়ে। বিশ্রাম করি আবার কোলকাতা কিংবা বোম্বাই চলি যাবেন - এই অবস্থাত গেইলে তোমার ম্যালা তকলিফ হইবে। কিন্তুক ভালো কাথা বা সদুপদেশ শোনার মানষি মুই আছিনুং না তখন, ভাবিনুং সত্যি কাথা কইলে সউগে মানি নিবে আর দরকার হইলে সাহায্য করিবে - তাই বোম্বাই পর্যন্ত-ই যাওয়া যাউক। তার পাছত পিসির বাড়িত পৌঁছিলে সউগ সমস্যার সমাধান হই যাবে।

কিন্তুক নাগপুর থাকি যে নয়া যাত্রীগিলা উঠিল, ওমরা মোর চুরি যাওয়ার কাথা তো বিশ্বাস-ই করিল না, উল্টা সন্দেহের চোখে মোর ভিতি তাকাবার ধইল্লেক। যেন মুই বিনা টিকিটের এক অবাঞ্ছিত মানষি।

তার পাছত ‘বদনারে’ স্টেশনের আগত এক কাঠখোট্টা কর্তব্যপরায়ণ পাঞ্জাবি চেকারের হাতত ধরা পড়িনুং। মোর তো আর সাক্ষী-প্রমাণ নাই, কায়-ই বা মোর কাথা বিশ্বাস করিবে - তাই চেকার সাহেব মোক ‘বদনারে’ রেলস্টেশনত নামেয়া দিয়া রেল পুলিশের এক সিপাহিক কইল - ইসকা ব্যবস্থা কিজিয়ে, বিনা টিকিট কা প্যাসেঞ্জার।

ট্রেন চলি গেইল, অন্তত দশ ঘণ্টার মইধ্যে আর কোনো ট্রেন নাই। রেল পুলিশের অফিসার ভদ্রলোক কইল - বোলো, তুমহারা পাস এক পয়সা ভি নেহি!

মুই কনুং - বিশ্বাস কিজিয়ে সব কুছ লুট লিয়া - সিরিফ এই কম্বল হ্যায়। কপর্দকশূন্য মানষিক নিয়া ঝামেলা করার কোনো মানে হয় না। পাথর টিপলে যেমন জল বাইর হয় না, মোক সার্চ করি যখন একটা কানাকড়িও পাওয়া গেইল না, তখন অয় কইল - দশ ঘণ্টা বাদ কোলকাতা যানে ওয়ালা ট্রেন আয়েগা, উসমে চড় যানা।

ওইদিকে মোর প্যাটত তখন ছুচায় ডন মারিছে, তাও প্যাট ভরি প্ল্যাটফর্মের কলের জল খায়া নিনুং। আর প্ল্যাটফর্মের একটা ফাঁকা বেঞ্চিত-ই কম্বল বিছেয়া শুতি পড়িনুং।

পাশের বেঞ্চিত-ই বসি আছিল জায়গীরদার বীরবিক্রম সিং। অয়-ই মোক ঘুম থাকি ডাকি তুলিল। সউগ কাথা শুনিল। তার পাছত কইল - কোই বাত নেহি। মুই ভারত ভ্রমণত বাইর হইছুং। মোর কোনো সাথী নাই। ভগবান তোমাক জুটেয়া দিছে, তোমরা মোর সাথে মুই যেইঠে যাম যাবু, তার পাছত মুই মোর জায়গীর নিহালগড়ত ফিরি যাম, তোমরাও কোলকাতা ওয়াপস চলি যাবু।

অয় মোর জামা-কাপড়, টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, বিছানা, সুটকেস, সউগ কিছু কিনি দিল। খিব মজার মানষি। ফাস্ট ক্লাস-এ ঘোরাঘুরি করে, টাকা-পাইসার কোনো অভাব নাই, সেই থাকি উয়ার সাথ-এ ঘুরির নাগিনুং মুই। বাড়ির কাথা, মাওয়ের কাথা, সউগ ভুলি গেনুং। কখনো কাশ্মীর, কখনো কন্যাকুমারী, কখনো ব্যাঙ্গালোর, কখনো কেদার-বদরী, কখনো চলি গেনুং দ্বারকা, কখনো গিরের জঙ্গলত। কখনো হাঁটা পথত, কখনো হাতিত চড়ি।

জায়গীরদার বীরবিক্রম সিং সউগ সময় হাসি-খুশি, দিল-দরিয়া। ঘুরতে ঘুরতে মোর একবার অসুখ হইল - অয় নিজের হাতে মোর সেবা করি সুস্থ করি তুলিল। ভারতের সউগ প্রদেশের প্রায় সউগ দেখার জাগা মোটামুটি ঘুরি বেড়াইনুং।

মনে মনে ভাবো, এই নাখান রাজকীয় ভাবে ঘুরি বেড়াবার বাদে ম্যালা টাকা দরকার। এত টাকা অয় কোটে পায়। বড় হোটেল-এ মোক নিয়া ওঠে - ফাইভ স্টার হোটেলত জাগা পাইলে আগত ফাইভ স্টার-এ ওঠে - না হইলে ফোর স্টার বা থ্রি স্টারের নিচত নামে না।

দুইটা মানষি ‘বদনারে’ স্টেশনের বাইরে ঘোড়া নিয়া অপেক্ষা করছিল। জায়গীরদার সাহেবের সউগ ব্যবস্থা-ই পাকা। কোথাও কোনো খুঁত নাই।

অয় কালা ঘোড়াত চড়ি কইল - এইঠে থাকি ছত্রিশ মাইল দূরত মোর রূপমহল। মুই যদি ঘোড়া ছুটেয়া আগে বাইরেয়া যাও, তেবে তোমরা পথের যে কোনো মানষিক সুধাইলে অয়-ই তোমাক জায়গীরদার বীরবিক্রম সিং-এর রূপমহল দেখেয়া দিবে। মুই এমনিতে অকম্মার ঢেঁকি। কামের মইধ্যে একটা কাম শিখছিনুং - সেটা হইল ঘোড়াত চড়া।

পথ কাঁচা - ধূলা-ধূসর। জায়গীরদার সাহেব ঘোড়া হাঁকেয়া চলিল আগত আগত, মুই উয়ার পাছত পাছত।

মুই মনে মনে ভাবো - আপনে আগেয়া গেইলে, মুই ঠিক ধরি ফেলাম, ঘোড়সওয়ার হিসেবে মুইও কমতি যাও না।

কিন্তুক একটা বাঁকের মুখত জায়গীরদার সাহেবের ঘোড়া অদৃশ্য হই গেইল - মুই আর উয়ার নাগাল পানুং না। তাও পথের মানষিক সুধেয়া সাঞ্ঝার ঠিক আগ-ই জায়গীরদার সাহেবের রূপমহলত পৌঁছি গেনুং।

সচায় রূপমহল-ই বটে। সামনত ফোয়ারা, আলোয় আলোয় কখনো জলের রং নাল, নীল বা সবুজ হচে, শ্বেতপাথর দিয়া গড়া এক সুন্দর প্রাসাদ।

ভিতরত আর বাইরে আলোর মালা। প্রাসাদের দরজা দিয়া ঢুকি একজনে কনুং জায়গীরদারের সাথে আসিছুং - ‘বদনারে’ স্টেশন থাকি অয় কালা ঘোড়াত চড়ি আইল, মুই সাদা ঘোড়াত।

- কন কি?
- ঠিক-ই কছুং।

- অয় তো দশ বছর আগে ভারত সফরত বাইরাবার বলি ঘোড়া নিয়া বাইর হইছিল, কিন্তুক ‘বদনারে’ স্টেশনত পৌঁছার আগ-ই একটা লরির সাথে মুখোমুখি দুর্ঘটনাত অয় মরি যায়।

- হইবার-ই পারে না। মুই তো কয় বছর ধরি সারা ভারত উয়ার সাথ-ই ঘুরি বেড়াইছুং। অয় মোর কাথা বিশ্বাস করিল না। দূরের একটা বড় অয়েল পেন্টিং দেখেয়া কইল - এ হি তো হামার পিতাজীর তসবীর।

মুই সেই অয়েল পেন্টিং-এর দিকে তাকানুং সেই এক-ই চেহারা, বীরবিক্রম সিং জী যেন মোর দিকে তাকেয়া মুচকি হাসিছে।

চিল্লা-চিল্লি শুনি সয়ং বিধবা রানী সাহেবা মানে বীরবিক্রম সিং-এর বউ নিচত নামি আইল। মুই ওমাক মোর হাতের হীরার আংটিটা দেখেয়া কনুং - এইটাও কি তবে মিছা? এই আংটিটা অয় ‘বদনারে’ স্টেশনত মোর স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে দিছিল। দেখেন অই তসবীরের হাতের আংটির সাথে হুবহু মিল।

সউগ কাথা শুনি রানী সাহেবা থরথর করি কাঁপি কাঁপি কইল - উনকা অংগুঠি অব তক নেহি মিলা!

মুইও জ্ঞান হারেয়া ফেলানুং ওইঠে। তার পাছত কিছুটা সুস্থ হইলে ওমরায় মোক কোলকাতাত পাঠেয়া দিল, কিন্তুক ওমরা হাতের আংটিটা খুলি নেয় নাই। বলির গেলে প্রায় দশ বছর পাছত মুই কোলকাতাত ফিরি আইনুং।

মোর মাও তো মোক দেখি অবাক! প্রথমে মাও হয়াও মোক চিনির পায় নাই। খবরের কাগজত আর রেডিও-টিভিত বহু বিজ্ঞাপন দিছিল - কিন্তুক গত দশ বছরে কোনো জবাব-ই পায় নাই।

তোমরা এইবার সউগে কও - বুদ্ধি দিয়া এই ঘটনার কি ব্যাখ্যা করিবেন। সউগে ঝিৎ, কারো মুখত কোনো কাথা নাই, খালি রামকানাই বাবু কিছুক্ষণ পাছত সুধাইল - আচ্ছা, স্যার, সেই আংটিটা এলা কোটে আছে?

- ওইটা এলা হাতত পিন্ধি ঘুরির ভরসা পাও না, হীরাটার দাম-ই হইবে দুই-তিন লাখ টাকা। ব্যাংকের ভল্টত থুইছুং - কায়ো যদি দেখির চায়, তা দেখির পায়।

রামকানাই বাবু মাথা নিচা করি বসি রইল। মুখত আর উয়ার কোনো কাথা নাই।

_______________সমুদ্র পাল

বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ

Post a Comment

Previous Post Next Post