ঝন্টু য্যেলা কোলের ছাওয়া— স্যেলা ওর মাওর কঠিন বিমার হইল্। সেই তানে ঐং আহ্লাদী পিসির কোলত্ মানুষ হয়। আহ্লাদী পিসি ঝন্টুর বাপের দূর সম্পর্কের বইন, মাথাত্ একনা কেমন যেন ছিট আছে বুলিয়া শ্বশুরঘর করির পায় নাই। আর কারণে-অকারণে এলামেলি আহ্লাদীর নাকান কথা কয়। সেই তানে উয়ার নাম হইছে আহ্লাদী। ঘরের ছাওয়া-ছোটো গুলা ওক তাই আহ্লাদী পিসি কয়। মাওর বিমার থাকি সেই যে ঝন্টুক ও কোলে তুলি নিল্, তার পাছত ছাওয়াটা ওর এমন ন্যাওটা হয়া গেইল যে মাওর বিমার ভালো হইলেও আহ্লাদী পিসি আর ওক কোল থাকি নামের চায় নাই। ঝন্টুও আহ্লাদী পিসি কইলে এক্কেরে অজ্ঞান। আহ্লাদী পিসি গাও ধোয়ায় দিবে, খোয়ায় দিবে, জামা-কাপড় পিন্ধায় দিবে আর ঘুম পাড়ায় দিবে। পিসিক না হইলে ঝন্টুর এক মুহূর্তও চলে না। ঝন্টুর মাও-ও সংসারের সাত ঝামেলাত দিন-রাতি জড়িয়া থাকে, তাই আহ্লাদী পিসির কোলত্ ছাওয়া ফেলায় দিয়া ওঁরও সগায় নিশ্চিন্দি।
আহ্লাদী পিসি মাছ খাবার বড় ভালোবাসে। বিশেষ করি শোল মাছ। ঝন্টু, য্যেলা একনা ডাঙর হইল্, ও পিসির তানে নানা নাকান মাছ ধরি আনে। পিসি এক গাল হাসি দিয়া কয়, ‘ভাগ্যিস মোর ঝন্টু আছিল্, তাই দুইটা মাছ-ভাত খায়া বাঁচো!’
বর্ষার সময় য্যেলা দেশের নদী-নালা ভরাট হয়া আসে— নিজের পুখুরত জল পড়ে, ঝন্টু গহীন রাইতত্ যাইয়া পোলো দিয়া নানা জাতের মাছ ধরি আনে; বিশেষ করি আহ্লাদী পিসির তানে শোল মাছ পাইলে ওর মুখত আর হাসি ধরে না।
আহ্লাদী পিসি ঝন্টুর বাপের সংসারত থাকে বটে, কিন্তু ওর নিজেরও বেশ কিছু টাকা আছে। সেই টাকা আহ্লাদী পিসি যক্ষের নাকান আগলি থোয়। খালি ঝন্টুক মাঝে মইধ্যে মিঠাই কিনি খোয়ায়। ঝন্টুর মাও ঠাট্টা করি কয়, ঠাকুরঝি, এমন করি তোমার টাকা গুলা নয়-ছয় করি ফেলাইস না।
আহ্লাদী পিসি রাগ করি উত্তর দেয়, মোর টাকা মুই যা খুশি করিম, রাস্তাত্ ছিটায় দিম, তাতে কার কী!
আসল কথা হইল্, এই ব্যাপার নিয়া ঘরের সগায় আহ্লাদী পিসিক খেপায়!
আহ্লাদী পিসি মরিলে যে ঝন্টুই গয়াত ওর পিন্ডি দিবে— এই কথাখান ও গর্ব করি সগাক কয়া বেড়ায়!
এই আহ্লাদী পিসি হঠাৎ তিন দিনের জ্বরত মরি গেইল্।
দিব্যি শক্ত-সমর্থ আহ্লাদী পিসি… দেহাত্ রোগ-বালাই নাই— এমন করি যে হঠাৎ মরি যাবে তা ঘরের কাও ধারণাই করির পায় নাই। দুর্দান্ত দস্যি ছাওয়া ঝন্টু… আহ্লাদী পিসির মরণের পাছত কায় যেন ওর মুখত বোবা-কাঠি ছুয়াঁয় দিছে। কারো সাথেই কথা কয় না, খায় না দায় না, উদাস চোখে একদিক চায়া থাকে। ছাওয়া দিন দিন শুকায় যাবার নাগিল্।
এই ব্যাপারত ঝন্টুর মাও বিশেষ ব্যস্ত হয়া পড়িল্। ঝাড়-ফুঁক-তাবিজ-মাদুলি— কিছুতেই কিছু নাই! ঝন্টুর দেহার রক্ত কায় যেন শুষি নিবার নাগিছে। ঘরসুদ্ধা লোক ভাবি কিছু কূলকিনারা পায় না!
রাইতত্ ঘুমের ঘোরত ঝন্টু কখনো কখনো ধড়মড় করি উঠি বসে।
মাও পোছে, হ্যাঁরে ঝন্টু, বিছনার উপর উঠি বইসিলু ক্যানে? এ্যালা তো অনেক রাইত। ঘুমি যা!
ঝন্টু ফ্যালফ্যাল করি এইদিক-ওইদিক চায়, তার পাছত ফিসফিস করি মাওক কয়, আহ্লাদী পিসিমা মোর কানের কাছে ডাকিল্ যে!
শুনি মাও শিউরি ওঠে। ঝন্টুর গাওত-মাথাত-পিঠত হাত বুলায় দেয়। মুখত কয়, রাম-রাম-রাম!
পাড়ার পাঁচজন বউ-ঝি কয়, অ ঝন্টুর মাও, ওর দিক বেশ কড়া নজর থোইস, পোড়ামুখী আহ্লাদী মরিয়াও ওক ভুলির পায় নাই। তাই বুঝি এ্যালাও আশেপাশে ঘুরঘুর করছে!
ঝন্টুগিলার বাড়ির তলত পুখুরপাড়ত একটা শ্যাওড়া গাছ; গাঁয়ের মানষিগিলা হাট থাকি সওদা করি ফেরার মুখত ওই শ্যাওড়া গাছের ডালত কাক যেন বসি থাকির দেখিছে।
বৃন্দাবন গাঙ্গুলী একদিন নাকি এক্কেরে সামনাসামনি পড়ি গেইছিলেন। কইলেন, ভাগ্যিস মুই বুদ্ধি করি পৈতাটা জড়ি ধরি গায়ত্রী জপ করির নাগিলুং! নাইলে ঝন্টুগিলার পুখুরের খালত মোর ঘাড় মটকি থুইত! –এই নাকান করি সারা গাঁওত একটা চাপা ফিসফিস আলোচনা! কাও বিশ্বাস করে, কাও হাসি উড়ি দেয়!
স্যেলা আষাঢ় মাস। আশেপাশের নদী-নালা বর্ষার জলত ভরাট হয়া গেইছে। ঘোলা জল পাক খাইতে খাইতে ধানের জমি ভরায়, মাঠ-ঘাট ডুবায়, উঁচা-নীচা গাঁয়ের পথ গুলাক পেছল করি ঝন্টুগিলার বাড়ির পুখুরের খালত সান্ধাছে।
স্যেলা বোধ করি দুপুর রাইত। এমন একটা আবছা জোনাক ফুটিছে যে আশেপাশে দূরত সগলি নজরত পড়ে, কিন্তুক ভাল করি ঠাহর করা যায় না। মনে হয় যেন একটা পাতলা কুয়াশা জোনাকের সাথত মিশি গোটা গাঁওটাক ঘেরি থুইছে।
মাওর পাশত শুতি ঝন্টু অকাতরে ঘুমাছে। ওমার ঘরের রান্নাঘরের পাছন দিক দিয়া একটা কালা বিলাই বিকট করি ডাকি চলি গেইল্। কোটে কোন ঝোপত বসি একটা ভূত-ভূত্তম পাখি একটানা বেসুরা করি ডাকি বিরক্তি জাগায় তুলছে। একটা থমথমা ঝিমঝিমা ভাব…
এমন সময় ঝন্টুর হঠাৎ মনে হইল্— ঘরের বাইরত খাড়া হয়া আহ্লাদী পিসি ওক ডাকছে। আহ্লাদী পিসি কইছে, ওরে ঝন্টু, শিগগির আয়— তোমারগিলার পুখুরের খালত নতুন জল আইচ্ছে। কত মাছ উঠিছে… দেখবু আয়! তোর পোলোটা নিবার ভুলিস না যেন!
আচমকা ঝন্টুর ঘুমটা ভাঙি গেইল্। ও বিছনার উপর উঠি বইসল্। আশেপাশে চায়া দেখিল্, সগায় অকাতরে ঘুমাছে। ওর মাওর ডাইন হাতখান ওর গাওত আছিল্। আস্তে আস্তে হাতখান ও সরায় থুইল্।
আহ্লাদী পিসি কইছে পোলো নিয়া যাবার। মন্ত্রমুগ্ধের নাকান ঝন্টু পাশের ঘরত সান্ধাইল্। ওইঠেই পোলো থাকে। বিলাইয়ের নাকান খুব সাবধানে পাও-টিপি-টিপি ও পোলো নিয়া দুয়ার খুলি বাইরত বেরিয়া আইল্।
কায় যেন কানের কাছে কইল্, দুয়ারটা ভেজি দে ঝন্টু, নাইলে ওমরা জাগি উঠিবে। ঝন্টু, বিনা প্রতিবাদে ওমার ঘরের দুয়ারটা ভেজি দিয়া হনহন করি পুখুরের খালের ধারত চলি গেইল্।
নিশুতি রাইত… কাও কোটে জাগি নাই… কলকল করি বর্ষার জল সান্ধাছে খালত… ঝন্টু ছপ্ ছপ্ করি পোলো ফেলাছে আর রাশি রাশি মাছ ধরছে। এত শোল মাছ কোট থাকি আইল্— ঝন্টু ভাবি কূলকিনারা পায় না। ও যে খালৈ সাথত আনিছিল্, সেটা মাছে ভরতি হয়া গেইল্। কীসের যেন একটা পোড়া গন্ধ ক্রমাগত ওর নাকত আসিল্। কার আকর্ষণত ঝন্টু সেই মাছ-ভরতি খালৈ নিয়া আগি চলিল্! এ কী! এ যে সেই শ্যাওড়া গাছ!
ফিসফিস কথা কানত আইল্।
—মোক শোল মাছ পোড়া খোয়াবু ঝন্টু?
ঝন্টু অবাক হয়া চায়া দেখিল্, শ্যাওড়া গাছের ডালত নাল শাড়ি পিন্ধি দিব্যি পাও ঝুলায় কায় যেন বসি আছে! আহ্লাদী পিসি না? দেখির ঠিক সেই নাকান!
এইবার ঝন্টুর জ্ঞান যেন ফিরি আইল্। আহ্লাদী পিসি তো মরি গেইছে! ও তাইলে কার ডাকত এই নিশুতি রাইতত মাছ ধরির ঘর থাকি বেরি আইছে? ভয়ত ওর মাথার চুলগুলা খাড়া হয়া উঠিল্। ও প্রাণপণ চেষ্টা করিল্ পালি যাবার… কিন্তুক পাও দুইটা কিছুতেই ওঠে না! মনে হয় এঁটেল মাটির কাদাত যেন বসি গেইছে! শেষকালে মনে জোর আনি ঝন্টু মরিয়া হয়া দৌড়ির নাগিল্। পাছন থাকি আহ্লাদী পিসির নাকি সুরত কান্দন শোনা গেইল্, ওঁরে ঝঁন্টু, শোঁল মাঁছগুলা মোক দিয়া যা— মুই আর কিচ্ছু চাঁইনে—
যত আহ্লাদী পিসির কথা কানত আসে ঝন্টু তত দৌড়ায়! হঠাৎ ও দেখিল্ একটা বিরাট নম্বা হাত শ্যাওড়া গাছের ওইদিক থাকি আসি ওর হাতের মাছের খালৈ ছিনি নিয়া গেইল্!
একটা আর্তনাদ করি ঝন্টু সেইঠেই অজ্ঞান হয়া পড়ি গেইল্। ওর চিৎকার শুনি বাড়ি থাকি লোকজন আসি য্যেলা পৌঁছিল্, ওর মুখ দিয়া গ্যাঁজলা বাইরাছে!
অনেক ভূত-তাড়ানো রোজা, বহু মন্তর, রাশি রাশি তাবিজ, কবচ, মাদুলি … কিছুতেই কিছু নাই… ঝন্টু অসাড় হয়া পড়ি থাকে— ডাকিলে সাড়া দেয় না!
অবশেষে মাওর বুকভাঙা কান্দনত তিনদিন পাছত ঝন্টু চোখ মেলি চাইল্। কিন্তুক কী হইছিল কোনো কথাই ও মনে করি গুছিয়া কবার পায় না, খালি বোকার নাকান ড্যাবডেবা চোখে চায়া থাকে।
গাঁয়ের মাতব্বর, পাড়াপ্রতিবেশী সগায় কইল্, দেখ ঝন্টুর মাও, এ্যালা থাকি ঝন্টুক এক্কেরে চোখে চোখে থুবার নাগিবে। পেতনিগিলা ওই নাকান করি নিশির ডাকত ভুলায় জলার ধারত নিয়া ঘাড় মটকি থোয়।
শুনি ঝন্টুর মাওর বুকের রক্ত শুকি যায়। সারা রাইত ধরি ছাওয়ার শিয়রত বসি জাগি থাকে মাও। ঘন ঘন দীর্ঘনিশ্বাস পড়ির থাকে। ভাবে মোর শান্তির সংসারত এ কী হইল্! কী কুক্ষণত পরের বেটিক ঘরত ঠাঁই দিছিনুং!
এইদিকে তার পাছত থাকিয়েই বাড়ির মানষি একটা অবাক কাণ্ড লক্ষ্য করির নাগিল্।
পাথরের মূর্তির নাকান পাগলা পাগলা চোখ নিয়া চায়া থাকে ঝন্টু।
হঠাৎ ও কয়া বইসল্, মুই পোড়া শোল মাছ খাম।
অমনি সাথেসাথে কোট থাকি একটা পোড়া শোল মাছ ঘরের মাঝখানত আসি পড়িল্! ভয়ত আঁতকি উঠিল্ সগায়।
ব্যাপার দেখি বাড়ির মানষি ঘন ঘন রাম নাম জপ করির নাগিল্।
কিন্তুক আস্তে আস্তে ব্যাপারটা সহজ হয়া আইল্— য্যেলা দেখা গেইল্ যে, ঝন্টু য্যেলা যা চায় কোনো অদৃশ্য হস্ত যেন সাথেসাথে তাই আনি হাজির করে!
সেদিন দুপুর গরমত আই ঢাই করিতে করিতে ক্ষীণকণ্ঠে ঝন্টু কইল্, মা, এক গেলাস ঠান্ডা জল দেও না!
মুখের কথা খসের যতটুক সময়!
দেখা গেইল্ শ্বেতপাথরের সুন্দর একটা গেলাসত টলটলা পরিষ্কার জল। ঝন্টু সেই জল খাবার যাছিল্— কিন্তুক ওর মাও হাত দিয়া সগল টুকুন মেজেত ফেলি দিয়া কইল্, কক্ষনো মুখত দিস না ঝন্টু ওগিলা পেতনিতে জোগাছে!
আরও একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেইল্ যে, এই জাতীয় ভৌতিক কাণ্ড রাইত বেলাতেই ঘটে।
সন্ধার পাছত পাড়ার গিন্নিবান্নিগিলা দল বান্ধি আসিত্ ঝন্টুক দেখির। কথায় কথায় গাঙ্গুলী গিন্নি কইলেন, মোর জর্দা গেইছে ফুরি! কাশীর জর্দা না হইলে আবার মোর মুখত রোচে না!
আপন মনে ঝন্টু কইল্, তুই কাশীর জর্দা খাবু ঠানদি? সাথেসাথে ঠন্ করি মেজেত পড়িল্ একটা কৌটা!
গাঙ্গুলী গিন্নি অবাক হয়া চিৎকার করি উঠি কইলেন, এই তো কাশীর জর্দা! এক্কেরে নতুন কৌটা! কোট থাকি আইল্ ঝন্টুর মাও?
আর যারা আশেপাশে আছিল্— ব্যাপারটা জানিত্— ওমরা উত্তর দিল্, গাঙ্গুলী গিন্নি বুঝি জানেন না? সগল ওই আহ্লাদী পেতনিতে জোগাছে।
জর্দার কৌটাটা গাঙ্গুলী গিন্নি হাতত তুলি নিবার যাছিলেন, কিন্তুক যেই আহ্লাদী পেতনির কথা শুনিলেন অমনি রাম রাম করিতে করিতে এক্কেরে নিজের বাড়ির দিক পাও চালায় দিলেন।
এই নাকান করি নানা জাতীয় ঘটনা ঘটিবার নাগিল্। হঠাৎ চাঁপা ফুলের গন্ধে গোটা বাড়িটা ম-ম করির নাগিল্, তার পাছ মুহূর্তেই পচা মাছের গন্ধে মানষি নাকত কাপড় দিয়া পালি যাবার পথ পায় না!
পাড়ার ছাওয়া গুলা সগায় মিলি ঘিরি থুইছে ঝন্টুক… কোটে কিছু নাই …হঠাৎ রাশি রাশি ইট পাটকেল পড়ির শুরু হইল্। কিন্তুক মজা এই যে, একটা ঢিলও ঝন্টুর গাওত নাগিল্ না। যেগিলা ছাওয়া ঘিরি থুইছে ওক, ওমার মাথাত পিঠত ক্রমাগত ভাদ্রের তালের নাকান আসি দমাদ্দম পড়ির থাকে! বাপ রে মা রে করি তখন যে-যেদিক পারে পালি যায় ওমরা।
যতদিন ব্যাপারটা তামাশা থাকে মানষি ভিড় জমায়… কৌতূহলী হয়া বসি থাকে পেতনির কাণ্ড দেখির। কিন্তুক কত রাইত মানষি এই নাকান করি না ঘুমি জাগির পারে?
কাজেই আস্তে আস্তে ভিড় পাতলা হয়া আসির নাগিল্। গমগমা বাড়ি আবার মানুষ-জন-শূন্যি… থমথমা হয়া আইল্।
কীসের যেন দুঃস্বপ্ন দেখি মাঝরাইতত্ ঝন্টুর মাওর ঘুম ভাঙি যায়! মাও ছাওয়াক বুকের কাছে প্রাণপণে টানি নেয়। বাঁশঝাড়ের পাছন দিক যেটে একটানা ঝিঁঝি ডাকি চলে, সেটে নাকিসুরে কার যেন হাসির রেশ শুনির পাওয়া যায়।
মাও চমকি উঠি বসে। ছাওয়ার মাথাত হাত থুইয়া সারা রাইত ধরি দুর্গা নাম জপ করির থাকে। কেবলি মনে হয় ওঁর কোলের ছাওয়াক কায় যেন ছিনি নিবার আসিছে।
সেদিন সন্ধা থাকিয়েই একটানা ঝিরঝিরি বৃষ্টি হইছে।
দূর বনত প্রহরে প্রহরে শিয়াল ডাকছে… মনে হইছে যেন ওমরাও খুব ভয় পাইছে। পাখি-পাখালিগিলা কখন যে যার যার বাসাত সান্ধিছে— কাও খবর রাখে না! গেরস্ত বাড়ির গোয়াল গুলাত গোরু গুলা এমন করি হামলাছে যে, মনে হয় ওমরা অশুভ কোনো ইঙ্গিত পাইছে। মাঝে মাঝে কাল-প্যাঁচার চ্যাঁচানি কানত ভাসি আসিছে।
শ্মশানের দিক থাকি একটা শোঁ শোঁ হাওয়া গাঁয়ের বুক চিরি উত্তর অঞ্চলের জলাভূমির উপর দিয়া বইছে! মনে হইছে কোনো প্রেতিনি বুঝি নিশ্বাস ফেলছে!
গাঁয়ের পথত আজ একটাও মানষি নাই। কোনো বাড়িত একটা ছোটো ছাওয়াও কান্দি উঠছে না! মনে হইছে রুদ্ধ আতঙ্কে সগায় প্রহর গণনা করছে!
ঝন্টুগিলার বাড়িত আজ সগাক কী কাল-ঘুমে পাইছে… কায় জানে!
সন্ধাবেলা উনুনত আগুন পড়ে নাই। বামুনদিদি ঘুঁটে আর কয়লা সাজেবার যাইয়া সেইঠেই ঘুমি পড়িছে। বাইরের ঘরত বাড়ির কর্তাগিলা সন্ধা থাকিয়েই দাবা-পাশা খেলির বসে! ওমার চিৎকারত দশটা আশেপাশের বাড়ির মানষি ঘুমির পারে না। আজ আঁধার ঘনায় আসার সাথেসাথে দাবার ছক একপাশে সরি থুইয়া সগায় ফরাসের উপর কাও চিত, কাও উপুড় হয়া পড়ি অঘোরে নাক ডাকি ঘুমাছে!
ঝর ঝর ঝর— অবিশ্রান্ত বর্ষণ চলছে— ওর একটানা শব্দের সাথত তাল বজায় থুইয়া খানা ডোবাত ব্যাঙগিলা আসর জমায় তুলিছে। আকাশের সগল তারা মেঘে ঢাকা পড়িছে। মাথার উপর কালপুরুষ একটা সাঙ্ঘাতিক কিছু ঘটিবে বুলি বুঝি এক চোখে দম বন্ধ করি প্রহর গণনা করছে!
মাওর পাশত শুতি অকাতরে ঘুমাছে ঝন্টু। এমন ঘুম যে দেখি মনে হয় ওর দেহাত বুঝি প্রাণ নাই!
আকাশের বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া, ঝিঁঝির ডাক, ব্যাঙের শব্দ, প্যাঁচার চ্যাঁচানি আর কালপুরুষের নীরব ইঙ্গিত ওক যেন এমন করি ঘুম পাড়াইছে যে ওই ঘুম আর ভাঙিবে না!
কিন্তুক হঠাৎ বেড়ার পাশত কার ফিসফিসে কথা শোনা গেইল্।
–ঝন্টু, উঠি আয়, জলার ধারত আজ মাছ থই-থই করছে!
ঝন্টু একমুহূর্তে সচকিত হয়া ওঠে।
আবার সেই ফিসফিসে আহ্বান ভাসি আইল্।
উদাস দৃষ্টিত ঝন্টু উঠি বইসল্।
কার ডাক— কোটে যাবার নাগিবে— কিচ্ছু জানে না— তবুও ও মাওর কোল ছাড়ি উঠি খাড়া হইল্ পাগলের নাকান।
আবার সেই বাঁশবনের কানাকানির নাকান কার যেন আহ্বান! – আজ আর পোলো নিস না ঝন্টু, খ্যাপলা জালটা হাতত নিয়া তাড়াতাড়ি মোর সাথত বেরি আয় —
এই প্রহেলিকাময় নিশির ডাকত সাড়া না দিয়া উপায় নাই!
ঝন্টু খ্যাপলা জালটা কাঁধের উপর তুলি নিল্, তার পাছত দুয়ারের হুড়কোটা খুলি ফেলি উঠানত বেরি আইল্।
সাথেসাথে কানত-তালা-নাগানো মেঘের গর্জন— আর বাদুড়ের ডানার ঝটপটি!
কিন্তুক মেঘের ডাকেও কারো ঘুম ভাঙিল্ না!
ছায়ামূর্তির হাতছানিত ঝন্টু জলার দিক আগি যায়।
পথত আন্ধার এত জমাট বান্ধি আছে… তবুও ওর পথ চলির কোনো অসুবিধা হয় না!
ওই যে ওইঠে। কত মাছ ঘাই মারছে…! তুই দেখির পারিস না ঝন্টু? আগি যা, ছুড়ি দে খ্যাপলা জাল—
অশরীরীর নির্দেশ শুনি ঝন্টু, এক্কেরে জলার মইধ্যেত পাও চালি দিল্। তার পাছত কচুরিপানার দামের মইধ্যেত ওর দেহাটা যে কোটে তলি গেইল্— সারা গাঁয়ের কাও জানির পাইল্ না!
খালি ঝন্টুগিলার বাড়ির কালা বিলাইটাই ওর মাওর দুয়ারের কাছে কান্দি কান্দি ফিরির নাগিল্।
মাওর কাল-ঘুম তবু ভাঙিল্ না!
***
পরের দিন জাইল্যাগিলা য্যেলা ঝন্টুর মৃতদেহাটা জালত টানি তুলিল্, সারা গাঁয়ের মানষি এক্কেরে হুমড়ি খায়া পড়িল্।
গাঁয়ের একজন বর্ষীয়সী মহিলা কপাল চাপড়ায় কইলেন, আহ্লাদী পোড়ারমুখী পেতনি হয়াও ওক ভুলির পারে নাই— তাইতো রাহু হয়া ঝন্টুক কোলত টানি নিল্!
বহু বছর হয়া গেইছে, এ্যালাও গাঁয়ের মানষিগিলা একনা বেশি রাইতত জলার ধার দিয়া যাবার ভয় পায়!
শেষ রাইতের দিক কায় যেন ওইঠে কান্দি কান্দি, এলো চুল উড়ায় বুক চাপড়ায় ছুটাছুটি করে!
[ পরশমণি (দেব সাহিত্য কুটীর), ১৯৫২ ]
---
বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ
হালিচা:
ভুতের গপ্পো