ডাইনি – তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

এলা আর ডাইনি নাই। যকিনি নাই। মায়াবিনী নাই।
সেই হিসাবত একালের ছাওয়ালা ভাগ্যবান।

হামারলার আমলত, মানে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বচ্ছর আগত ডাইন আছিল। ডাইন, ডাকিনি, মায়াবিনী। একালের ছাওয়ালা ডাইন ডাকিনির কথা শুনি হাসি উঠিবে। কিন্তুক সেই আমলত হামারলার জিউ ভয়তে শুকি গেছিল ইগলার নামে।

হামার গেরামত হামারলার বাইরের বাড়ির পূব মুড়াত বড়ো একখান পুখুর, বড়ো বড়ো তালগাছে ঘিরা। তার উত্তর-পূব কোণত আছিল স্বর্ণ ডাইনের ঘর।

একেবারে গেরামের শেষ। একপাখে জালুয়া পাড়া— অন্য পাখে বাউরি পাড়া— মাঝখানত খানিকটা খালি জাগা। সেই খালি জাগাত একখান অশ্বত্থ গাছ। সেই গাছতলাত ছোটো একখান ঘর। তার পাছত, মানে স্বর্ণের বাড়ির পাছত পূব পাখে আর বসতি নাই, খোলা পড়ি গেইছে। বালু আর লাল মাটির খোলা। সেই খোলার মইধ্যত লালুকচাঁদা নামের পুখুরটা আছিল গেরামের শ্মশান, ইয়াত অবশ্য মড়া পোড়ায় না, মুখাগ্নি করে। চাইরোপাখে ছড়ি ছিটিকি পড়ি থাকিত— মড়ার বিছানা মাদুর, বালিশ ন্যাকড়া বাঁশ, মাটির সরা ভাঁড় আধা-পোড়া কুঁচি কাঠি। পুখুরটার উপর একখান ঝাঁকড়া বটগাছ। দিনের বেলাতেও কাঁয়ো সেই গাছতলাত যায় না। রাইতত সেইটা জমাট আন্ধারের নাখান থমথম করে।

স্বর্ণ নিজের ঘরের দাওয়াত বসি তাকি থাকিল— সেই বটগাছটার পাখে।

হামরা সেটায় ভাবিছিলং।

নাইলে— খোলাটা যেটে শেষ হইছে— সেটেই শুরু হইছে ধানের খেত। সবুজ শস্যক্ষেত। কিন্তুক ডাইন কি সবুজ ভালোবাসে? না— বাসিবার পারে?

স্বর্ণ ডাইন। হামারলার দেশের ভাষাত ‘স্বনা ডান’।

শুকনা কাঠির নাখান চেহারা, শক্ত দুই পাটি দাঁত, একনা কুঁজা, মাথাত একমাথা কাঁচা-পাকা চুল। চোখ দুইটা নরুনে-চেরা চোখের নাখান ছোটো। উয়াত খয়েরি রঙের তারা। বিচিত্র থির দৃষ্টি। ভাবলেশহীন শুকনা— যেন খটখট করিত দুইটা হলদে পাথর ওই শুকনা ডাঙার বুকত। ডাইনের দৃষ্টি!

এই দৃষ্টিতে ডাইনিলা কচি নধর দেহের, সুন্দর সুশ্রী মানষির, চেংরি নয়া বউয়ের দেহের হাড় চামড়া মেদ মাংস ভেদ করি— ভিতরত ঢুকি— খুঁজিত প্রাণপুত্তলি। উয়াক পাইলে চুষি চুষি খাই ফেলে। নধর মানষি শুকি হাড়-চামড়া সার হয়া যায়, সোনার নাখান দেহের বর্ণ কালা হয়া যায়; চেংরি নয়া বউয়ের সব লাবণ্য ঝরি পড়ে; শুদু মানষি ক্যানে কচি পাতাত ভরা লকলকে সতেজ গাছ অকস্মাৎ শুকি যায়। ডাইনিলা তারও সরস প্রাণটুকু চোখের যোগে পান করি নেয় নিঃশেষ।

স্তব্ধ গরমের দুপ্রাবেলা তালগাছের মাথাত চিল চ্যাঁচায়— চি-ই-ই-লো! চি-ই-ই-লো, চি-ই-ই-লো!

কান পাতি শুনিলে শুনা যায়— ঘরের দাওয়াত আসি ডাইন তার সুরে সুর মিলাই সংগীত গায়— অনুনাসিক মিহি সুরে গায়— হি-ই-ই-ই-হু। হি-হ-হ-হ-হুঁ!

রাইতত— গহীন রাইতত স্বর্ণ ডাইনের ঘরের দেওয়ালত কান পাতিলে শুনা যায় – শব্দ উঠে— হুট-পাট, হুট-পাট, হুট-পাট।

বাট বইছে স্বর্ণ। যারা ডাইন তারা ভগবানের অভিশাপত রাইতত মাটির উপর বুকত হাঁটি বেড়ায়। বাট বয়।

ভয় হয় না ইয়ার পাছত?

***

স্বর্ণ তরিতরকারি বেচি বেড়াইত। ওইটা আছিল তার জীবিকা। তিন-চার ক্রোশ দূরের হাট থাকি কিনি আনিত, বেচিত আশপাশের গেরামত। পান, কাঁচকলা, পাকা রম্ভা, শাক, কুমড়া এইসব। হামারলার গেরামত সে বেচিত না। আশপাশের গেরামতেই বেচিত। গেরামের কারো বাড়িত ঢুকিবার সে চাইত না। কী জানি কার অনিষ্ট সে কখন করি বসিবে! তার ভিতর যে লোভটা আছে, সেইটা যখুন লক লক করি জিভ বার করে— তখুন তো স্বর্ণের বারণ শুনিবে না। কিন্তুক স্বর্ণ যে লাজত মরি যাইবে। ছি-ছি-ছি! ওর ভিতরের ডাইনিটা তো ওর অধীন নহায়। সেই তো ওর জীবনের মালিক, তারই হুকুমে ওক চলিবার হয়। তার হুকুম ছাড়া ওর মরিবারও অধিকার নাই। তার ভিতরের যে ডাইনিটা সেইটা যে এক সিদ্ধ-বিদ্যা, উয়াক কোনো নয়া মানষিক না-দেওয়া পর্যন্ত স্বর্ণ মরিবে না।

স্বর্ণের মাসি কি কাঁয়ো আছিল ডাইন।

মৃত্যুকালত আত্মীয়স্বজনলাক খবর পাঠাইছিল। কিন্তুক কাঁয়ো যায় নাই। ভয়তে যায় নাই, যদি সে কোনো কৌশলে তাক দিয়া যায় ওই সর্বনাশা ভয়ংকর বিদ্যা! সেইটা যে ডাইন হয়া যাইবে।

মৃত্যুর পাছত স্বর্ণ গেইল। নিশ্চিত হয়াই গেইল। বিদ্যা সেইটা তো কাক দিয়া গেইছে। নাইলে মরণ হইল ক্যামন করি? যাই দেখে— তখুন মাসির অনেক আত্মীয় আইসছে, মাসির যা আছিল ভাগ করি নিছে। সগায় চলি গেইল। বিধবা চেংরি স্বর্ণ বসি রইল দাওয়ার উপর। তার যেমুন অদৃষ্ট!

হঠাৎ ম্যাও ম্যাও শব্দ করি মাসির পোষা বিলাইটা তার গা ঘেঁষি বসিল। ওইটাকেই কাঁয়ো নিয়া যায় নাই। বিলাইটা তার গাত গা ঘষিল, গর গর শব্দ করিল, লেজটা উঁচা করি তার নাক-মুখত ঠেকি দিল। যেন কয়— মোক তুই নিয়া চল। তুই কিছুই পাস নাই, মোকও কাঁয়ো নেয় নাই।

স্বর্ণের মায়া হইল। নিয়া আইল বিলাইটা। মাছ ভাত দুধ খাওয়ায়, কোলের কাছত নিয়া শোয়ায়। পাশের জালুয়া পাড়াত যায়, বাউরি পাড়াত যায়।

সেইদিন হইচই উঠিল জালুয়া পাড়াত।

জালুয়ালার একটা কচি ছাওয়ার কী হইছে। ধনুকের নাখান বাঁকি যাইছে, আর কান্দিছে— কান্দিছে যেন বিলাইের নাখান আওয়াজ করি! –এ্যাঁ-ও। অবিকল বিলাইের শব্দ।

গুণিন আইল। গুণিন দেখি কয়— ডাইনের কাম! কিন্তুক—

কিন্তুক কী?

ডাইনটা মনে হয়—

কবার নাগিল না শেষটা— স্বর্ণের বিলাইটা ছুটি আইল উঠনত, রোঁয়া ফুলাই লেজ ফুলাই– এ্যাঁ-ও শব্দ করি থাবা পাতি বসিল।

—এই। এই তো বিলাইটা, এইটায় ডাইন।

—বিলাই ডাইন?

—হ্যাঁ। কোনো ডাইন মরিবার সময় ওক দিয়া গেইছে ডাইনি বিদ্যে।

—ঠিক কথা। স্বর্ণের মাসি আছিল ডাইন। বিলাই তো তারই! কী সর্বনাশ!

একটা জোয়ান জালুয়ার ছাওয়া— দুরন্ত রাগে— বসাই দিল এক লাঠি তার মাথার উপর। মাথাটা প্রায় চুর হয়া গেইল। কিন্তুক তবু মরিল না। লেজ পাছড়াইতে নাগিল, নখগিলা বার করি মাটির উপর আঁচড়াইতে নাগিল।

গুণীন কয়— সাবধান! কাঁয়ো কাছত যাইবে না। ওইটা এলা ডাইন মন্ত্রটি দিবার চেষ্টা করিবে। নাইলে ওর মৃত্যু হইবে না।

সেই মন্ত্র পড়িল, নিজের অঙ্গবন্ধন করিল— তার পাছত সন্তর্পণে লেজত ধরি বার করি ফেলি দিয়া আইল গেরামের শেষত।

স্বর্ণ ঘরত বসি ভয়তে কাঁপি উঠিল।

লোক উয়াক গালি দিয়া গেইল। ক্যানে আনিছিল সে ওই পাপক।

সন্ধ্যার মুখত কয়টা ছাওয়া পথ দিয়া গেইল— তারা কই গেইল— বিলাইটা এখনও মরে নাই। ইঃ কী গোঙাইছে; বাপরে! শিউরি উঠিল তারা।

স্বর্ণ গেইল চুপি চুপি। না-দেখি থাকিবার পারিল না।

সাদা দুধের নাখান বিলাইটার রঙ— রক্তে-ধুলায় পিঙ্গল হয়া গেইছে। কী যন্ত্রণাকাতর শব্দ!

স্বর্ণ আগি গেইল— দুই-পা, এক-পা করি।

উয়াক স্পর্শ করিল।

বিলাইটা মরি গেইল।

স্বর্ণের এ কী হইল?

স্বর্ণের চোখত এ কী দৃষ্টি! এ কী হইল তার? এ সব সে কী দেখিছে? ওই যে গাভিন ছাগলটা যাইছে— তার গর্ভের ভিতরত দুইটা ছাগল ছাওয়াক দেখিবার পাইছে। ওই যে কলা গাছটা— ওর ভিতরত দেখিবার পাইছে— কলার মোচা।

তার জিভ সরস হয়া উঠিছে! লক লক করি উঠিছে!

এ কী হইল তার? হে ভগবান!

***

এমনি করি নাকি স্বর্ণ হইছিল ডাইন।

সে আর কাক ডাইনি বিদ্যে দিবে— তাবে তার মরণ হইবে। নাইলে ওই মাথা-ভাঙা বিলাইটার নাখান কাতরাইবে, কাতরাইবে, কাতরাইবে— তবু তার মৃত্যু হইবে না।

মৃত্যু চোখের সামনত বসি থাকিবে।

ওই কইবে— মোক নাও গো! মোক নাও।

মৃত্যু কইবে— কী করি নিম? ওই বিদ্যে তুই আগত কাক দে— তাবে নিম। নাইলে তো পারিম না! স্বর্ণের হাত নাই তার ভিতরের ডাইনের উপর। সেই কি গেরামের কারো বাড়ি যাইবার পারে? বাপরে!

মোর অনেক বয়স পর্যন্ত স্বর্ণ বাঁচি আছিল। মুই কইতাম— স্বর্ণ পিসি।

ছোটোবেলাত কখনো তার সামনত যাইবার সাহস হইত না। বড়ো হইবার পাছত ওই পথে গেইছি-আইসছি; নিজের ঘরের আধো-আন্ধার আধো-আলোর মইধ্যত চুপ করি বসি থাকিবার দেখিছি। চুপ করি বসি থাকিত। কারো সথে কথা কইত না। কাঁয়ো কথা কইলে— তাড়াতাড়ি দুই-একটা জবার দিয়া ঘরত ঢুকি যাইত।

মোর বিশ-বাইশ বছর বয়স যখুন হইল, তখুন মুই তার বেদনা বুঝিলাম। মর্মান্তিক বেদনা আছিল তার। নিজেও সে বিশ্বাস করিত সে ডাইন। কাক স্নেহ করি সে মনে মনে শিউরি উঠিত। কাক চোখে দেখি ভালো নাগিলে চোখ বন্ধ করিত; চোখের ভালো নাগার অবাধ্যতাক তিরস্কার করিত। তার আশঙ্কা হইত, সে বুঝি উয়াক খাই ফেলিবে; হয়তো-বা খাই ফেলাইছে বলি শিউরিও উঠিত। মনে হইত ডাইনিমন্ত্র বিষাক্ত তার ভালোবাসা— লোভ হয়া তিরের নাখান গিয়া উয়াক বিঁধি ফেলাইছে তার হৃৎপিণ্ডত।

ডাইনিতে আজি আর বিশ্বাস করি না। এ-কালের ছাওয়ালাও করে না। কিন্তুক স্বর্ণ ডাইনের ডাইনিত্বের একটি বিচিত্র পরিচয় মোর স্মৃতিত অক্ষয় হয়া আছে। সেই কথাটি কইম।

তখুন মোর বয়স নয় কি দশ। কিন্তুক ঘটনাটি আজিও মনে হয় এই ক-দিন আগের দেখা ঘটনা। হঠাৎ শুনিলাম— ও-পাড়ার অবিনাশ দাদাক স্বর্ণ ডাইন খাইছে। মানে ডাইনে নজর দিয়া— দৃষ্টিবানে বিদ্ধ করিছে, তার ভিতরত ঢুকি উয়াক শুষি খাইছে। গেরামটা একেবারে তোলপাড় করি উঠিল। বিখ্যাত গুণিন আছিলেন হামারলার বাড়িত। মোর বাবা গেরামের বাইরত বাগানত তারা-মন্দির প্রতিষ্ঠা করিছিলেন। সেইখানে থাকিতেন এক সন্ন্যাসী— পশ্চিম দেশীয় সাধু। মুই তাঁক কইতাম গোঁসাইবাবা; মানে গোস্বামী বাবা। তিনি জানিতেন অনেক বিদ্যা। তাঁক খবর দেওয়া হইল। তিনি আইলেন; মুই তাঁরই সথে গেলাম স্বর্ণ ডাইনের কীর্তি দেখিবার আর গোঁসাইবাবার ডাইন তাড়ানো দেখিবার।

অবিনাশ দাদা, অবিনাশ মুখুজ্জের বয়স তখুন সতেরো-আঠারো। বাড়িত আছে মা আর দুই বইন। অবিনাশ দাদার মা— গোঁসাইবাবাক কন গোঁসাই দাদা। অবিনাশ দাদা কন— গোঁসাই মামা। অবিনাশ দাদার বাড়ি তখুন লোকত লোকারণ্য; স্বর্ণ ডাইন অবিনাশক খাইছে, রামজি সাধু ঝাড়িবেন।

মেটে কোঠার উপরত অবিনাশ দাদা শুতি আছেন চোখ বন্ধ। প্রবল জ্বর। ডাকিলে সাড়া নাই। মাথার শিয়রত বসি মা। পাশে বসি বইন। চোখের জল ফেলাইছেন। রামজি সাধু যাই একপাখে বসিলেন তার পাশেই মুই।

ডাকিলেন— ভাগনা। অবিনাশ ভাগনা।

কোনো উত্তর দিলেন না অবিনাশ দাদা।

—অবিনাশ! এ! গাত নাড়া দিলেন।

এইবার অবিনাশ ঘুরি শুইল। কইলে— মর হা-ঘরে গোঁসাই। মুই মেয়েছেলে। মোর গাত হাত দিছিস ক্যানে?

—হুঁ! তু কৌন? মেয়েছেলে? কে রে তু?

অবিনাশ উত্তর দিল না।

—এ! তু কে রে? এ?

—কইম না।

— কইবি না।

—না।

মন্ত্র পড়া শুরু হইল। বিড়বিড় করি মন্ত্র পড়েন আর ফুঁ দেন— ছু! ছু! ছু!

পরিত্রাহি চিৎকার করে অবিনাশ। কইছি, কইছি, কইছি!

তবু মন্ত্র পড়া চলিল, সথে সথে ফুৎকার। —ছু! ছু! ছু!

—বাবা রে, মা রে! মরি গেলাম রে! ও গোঁসাই আর মাইরো না! কইছি মুই কইছি।

—বোল! বোল তু কে? বোল!

—-মুই স্বর্ণ!

আজিও স্পষ্ট কানে শুনিবার পাইছি। -মুই স্বর্ণ! চোখে সব দেখিবার পাইছি! থাক সেকথা!

গোঁসাই প্রশ্ন করিলেন— স্বর্ণ? তু কাহে হিয়া? আঁ? ইয়াত কাহে?

—মুই একে খাইছি যে।

—হাঁ— হাঁ। উ তো জানছি। ওহি তো শুধাইছি— কাহে— কাহে খেলি?

—কী করিম? মোর ঘরের ছামনে দিয়া এই বড়ো বড়ো আম হাতত নিয়া যাইছিল, মুই থাকিবার পারিলাম না, মুই আম না পাইয়া ওকেই খাইলাম।

—কাহে, তু মাঙলি না কাহে? কাহে কইলি না— হামাকে দাও?

—কী করি কইম? একে লোভের কথা, তার উপরত মেয়েলোক, মুই লাজত কইবার পারিলাম না।

—হাঁ! তব ইবার তু যা। ভাগ।

—না। তোমার পাওতে পড়ি, যাইবার মোক কইয়ো না।

আদেশের সুরে,গোঁসাই কইলেন— যা তু। হামি বলছে।

—না। বিদ্রোহ ঘোষণা করিলে অবিনাশদার মুখ দিয়া স্বর্ণ ডাইন।

—না? আচ্ছা। এ দিদি, আন সরষা।

সরষে আইল। হাতের মুঠাত সরষা নিয়া বিড়বিড় করি মন্ত্র পড়ি— ছুঁ শব্দে ফু দিয়া ছিটাই মারিলেন অবিনাশ দাদার গাত।

চিৎকার করি কাঁদি উঠিল অবিনাশ দাদা— বাবারে, মারে, ওরে মারি ফেলিল রে। ওরে বাবা রে!

আবার মারিলেন সরষের ছিটা।

—যাইছি, যাইছি, যাইছি, মুই যাইছি, আর মাইরো না। মুই যাইছি।

—যাবি?

—হ্যাঁ, যাইম।

সথে সথেই অবিনাশ কাঁদি উঠিল— ওগো, যাইবার যে পারিছি না গো।

—পারিছিস না? চালাকি লাগাইয়েছিস, আঁ? হাত তুলিলেন রামজি সাধু, মারিবেন ছিটা। অবিনাশ চিৎকার করিলে আবার না না। যাইম, যাইছি।

— যাবি?

—হ্যাঁ যাইম।

—তব্ এক কাম কর। ঘরের বাহিরে একঠো কলসিমে জল আছে, দাঁতত উঠাকে লে যা। নেহি তো—

—তাই, তাই যাইছি।

জ্বরত অচেতন অবিনাশ উঠি খাড়া হইল। দাদার মা ধরিবার গেলেন। রামজিবাবা কইলেন— না। ঘর থাকি অবিনাশ বার হইল। চোখত বিহ্বল দৃষ্টি তার। ঘরের বাইরত দোতালার বারান্দাত জলপূর্ণ কলসি আগত থাকিয়াই থোয়া আছিল, সেইটার কানা দাঁতত কামড়ি তুলি নিল। দাঁতত ধরিয়াই সে নামি গেইল সিঁড়ি বায়া, উঠনত নামিল, বাইরের দরজার সামনত আসি খাড়া হইল, দাঁত থাকি কলসিটা খসি পড়ি ভাঙি গেইল, সে নিজেও পড়ি গেইল মাটির উপর— ধরিলেন গোঁসাইবাবা। এইবার বিপুল বলশালী পশ্চিম দেশীয় সন্ন্যাসী কিশোর বা সদ্য-যুবা অবিনাশক ছোটো ছাওয়াটার নাখান পাঁজাকোলে করি তুলি উপরত আনি বিছানাত শুয়াই দিলেন। গোঁসাইবাবার পাশে পাশেই আছি মুই। এইবার গোঁসাইবাবা ডাকিলেন- অবিনাশ! মামা!

— অ্যাঁ?

—কেমন আছ?

—ভালো আছি।

কয়েক ঘণ্টার মইধ্যেই অবিনাশ দাদার জ্বর ছাড়ি গেইল। মোর শিশুচিত্তত ডাইন আতঙ্ক দৃঢ়বন্ধ হয়া গেইল। স্বর্ণ সেই দফা যে মার খাইছিল, একথা বলাই বাহুল্য।

অনেকদিন পাছত, তখুন মোর বয়স তেরো-চোদ্দো বচ্ছর। স্বর্ণ হঠাৎ হামারলার বাড়ি যাওয়া-আসা শুরু করিলে। পান তরকারি নিয়া আইসত। শুনিলাম, ফুল্লরাতলাত যাওয়া-আসার পথত মায়ের সথে স্বর্ণের কথাবার্তা হইছে। মা উয়াক কইতেন, ঠাকুরঝি। ওইটুকুতেই সে কৃতার্থ।

স্বর্ণ আইসত এর পাছত হামারলার বাড়ি। মোর ভয় চলি গেইল। স্বর্ণক বুঝিবার নাগিলাম। পথত যাইতাম, দেখিতাম স্বর্ণ নিজের দাওয়াত বসি আছে আকাশের পাখে চায়া, অথবা আধো-আন্ধার ঘরের দুয়ারটিত ঠেস দিয়া বসি আছে। নিঃসঙ্গ পৃথিবী পরিত্যক্ত স্বর্ণ।

স্বর্ণ ছাড়া আরও অনেক ডাইন আছিল। তার চেয়ে গপ্প আছিল অনেক বেশি। প্রকাণ্ড খোলাত একটা অশ্বত্থগাছ আছিল। খোলাটার চাইরোপাখে আর যে গাছগিলা আছিল সেগিলা সবই বট, মাঝখানত ওই অশ্বত্থগাছটা খানিকটা হেলি খাড়া আছিল। একপাখের শিকড় উঠি বারি পড়িছিল, মনে হইত গাছটার আধখান আছে আধখান নাই। শুনিতাম ওইটা ডাকিনির গাছ। দেশত নাকি আছিল ভারি এক গুণিন। কাউরের মানে কামরূপের বিদ্যাও তার জানা আছিল। একদিন গরমকালের রাইতত গেরামের শেষত বসি কয়েক জন বন্ধুবান্ধব মিলি গান গপ্প করিছে, এমন সময় আকাশপথত একটা শব্দ শুনা গেইল। প্রচণ্ড বেগে যেন একখান মেঘ উড়ি চলিছে। সগায় বিস্মিত হইল— এ কী? আশ্চর্য মেঘ তো!

গুণিন হাসি কইলে— মেঘ নহায়, গাছ উড়ি চলিছে।

—গাছ? গাছ উড়ি চলে? –কি কইছ?

—চলে। কামরূপের ডাকিনি বিদ্যা যারা জানে, তারা গাছত বসি বিদ্যার প্রভাবে গাছক উড়াই নিয়া চলে— দেশ থাকি দেশান্তর। ডাকিনি চলিছে আকাশপথে।

বিশ্বাস করিল না কাঁয়ো। কইলে— তুই ধোঁকা দিছিস।

—দেখিবে?

—দেখাও।

গুণিন হাঁকিবার নাগিল মন্ত্র। আকাশত একটা চিৎকার উঠিল, চিলের নাখান চিৎকার, একসথে যেন বিশ-পঁচিশটা চিল দুরন্ত রাগে আকাশের বুক চিরি চিৎকার করি উঠিল, ঈ—!

সগায় ভয়তে কাঁপি উঠিল। কিন্তুক গুণিন আপন মনে মন্ত্র উচ্চারণ করিয়াই চলিল। মেঘের নাখান জিনিসটার গতি থামিল না, কিন্তুক সেইটা সামনত আর ছুটিল না। পাক খায়া ঘুরিবার নাগিল। ঘুরিতে ঘুরিতে মাটির উপরত নামি আইল এক অশ্বত্থগাছ। গুণিনের মন্ত্র তখুনও থামে নাই। মাটি ফাটিল, গাছের শিকড় মাটির সেই ফাটলত ঢুকিল, গাছটা ইয়াত জন্মানো গাছের নাখান সোজা হয়া খাড়া হইল। তার চেয়েও বিস্ময়ের কথা— গাছের মাথাত দেখা দিল অপরূপ সুন্দরী এক মেয়ে, একপিঠ এলোচুল কিন্তুক সম্পূর্ণ বিবস্ত্র।

লোক মাথা নিচা করিল।

ডাকিনি কইলে— মোক নামাইলি তুই গুণিন, দশের সামনত এই অবস্থাত! মোক লাজ দিলি? মুই ডাকিনি হইলেও মেয়েছেলে, মোর লাজ রক্ষা কর, মোক কাপড় দে।

গুণিন হাসিল।

ডাকিনি তখুন হাত বাড়াই কইলে দে, কাপড় দে।

গুণিন হাসি ঘাড় নাড়িলে। —সবুর করো। সবুর করো।

কিন্তুক যারা গুণিনের সঙ্গী— উমারালার সবুর হইল না; একজন কইলে— ছি ভাই! গুণিন উয়াক ধমক দিলে – না।

ততক্ষণে আর একজন অতর্কিতে গুণিনের কাঁধের গামছাখানাই টানি মেয়েটিক ছুড়ি দিলে। গুণিন আঁতকি উঠিল— করিলি কি? করিলি কি?

ডাকিনি খিলখিল করি হাসি উঠিল। গামছাখানাত মাথা থাকি পাও পর্যন্ত সামনের পাখে ঢাকি নিয়া হেঁট হয়া পাওয়ের পাখে গামছাটার প্রান্তটা ধরি উপর পাখে টানি নিয়া পাছনের পাখে মাথা পার করি ফেলি দিলে। গুণিন মর্মান্তিক চিৎকার করি উঠিল— সগায় সভয়ে দেখিলে, গুণিনের দেহের চামড়াও পাওয়ের পাখ থাকি ছিঁড়ি ক্রমশ মাথার পাখে গুটাই পাছনের পাখে উলটাই গেইল। চামড়া ছাড়ানো মানষিটা পশুর নাখান আর্তনাদ করি উঠিল। ডাকিনির খিলখিল হাসি উচ্চ থাকি উচ্চতর হয়া উঠিল। সেই যাইয়া আবার চাপিল সেই গাছত। গুণিন সেই অবস্থাতেই তখুনও মন্ত্র পড়িছিল; মন্ত্র আধখানার বেশি পড়িবার পারিল না সে। গাছটা আধখান উঠিল না, আধখান ছিঁড়ি আবার উঠিল আকাশত। আবার আকাশত শব্দ হইবার নাগিল। উড়ন্ত মেঘের নাখান চলি গেইল— কোটে নিরুদ্দেশ হয়া। ওই অশ্বথ গাছটা সেই আধখান গাছ।

আজি সেই কালের পরিবর্তন হইছে। ডাইনিও আজি আর নাই কইলেই হয়। ডাইনিতে বিশ্বাস ধীরে ধীরে লোপ পায়া আসিছে। অশিক্ষার গাঢ় আন্ধারত যারা আজিও ডুবি আছে উমারালার মইধ্যত হয়তো আছে। সেই কালের ডাইনের বিচিত্র গপ্পও আজি লোকে ভুলি আসিছে। এই গপ্পগিলার মইধ্যত শুদু আন্ধা বিশ্বাসই তো নাই— আছে কত মানষির মর্মান্তিক বেদনা। সারাটা জীবন তারা এই অপবাদের গ্লানি বহন করি চলিত, নিজেও সে বিশ্বাস করি নিত এই অপবাদক সত্য বলি, আর ভগবানক ডাকিত— স্বর্ণের নাখান— মোর এ-লাজের বোঝা নামাই দাও প্রভু, এ ভয়ংকর জীবনের অবসান করো। চোখের জল মুছি ফেলিত কাপড়ের আঁচলত; মাটিত কোনোক্রমে একফোঁটা ঝরি পড়িলে শিউরি উঠিত; মা বসুমতীর বুক যে জ্বলি উঠিবে!

---

বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ

Post a Comment

Previous Post Next Post