হাজরা রোডের মোড়ত ট্রামের তানে খাড়া হয়া আছোঁ, বেলা দুইপহর। বালিগঞ্জের ট্রাম আর নাই আসে, এদিক ভাদর মাসের রইদ পিঠত চড়চড় করিয়া ফুটি ধরে আলপিনের নাকান। ওই অতখান পর কালীঘাটের পুল থাকি ধীরে ধীরে নামি আসিতে দেখা যায় শ্রীযুক্ত ট্রামখান।
এমন সময় রাস্তা পার হয়া ছোট্ট একটা ছোঁয়ালি মোর কাছে আসি খাড়া হইল। কইল, ‘আপনি কি ডাক্তার?’
ভাবিতেই পারোঁ নাই ছোঁয়ালিটা মোক কিছু কবার ধরিছে, সেইতানে কথাখান শুনিয়াও গাও করোঁ নাই। কিন্তু তার পাছতেই ছোঁয়ালিটা সিধা মোর মুখের দিকে তাকায়া কইল, ‘দেখেন, আপনি কি ডাক্তার?’
খুব অবাক হইলোঁ, এখনা যেন খুশিও— ‘ক্যাং করি বুঝিলু?’
‘ওই যে তোমার পকেটত বুক দেখিবার যন্ত্র। দেখেন, মোর মাওয়ের বড় অসুখ, আপনি কি একবার দেখি যাবেন?’
ছোঁয়ালিটা এমন করি কথাটা কইল যেন এইটা কিছু অদ্ভুত বা বড় কথায় নোহায়। মুঁই তো কি কইম ভাবি না পাং। এদিক ট্রাম আসি গেইছে, একখান ট্রাম ফসকাইলে এই কড়া রইদত আবার হয়তো পনেরো মিনিট খাড়া হইতে নাগিবে।
ছোঁয়ালিটা ভাঙা ভাঙা গলাত কাতর হয়া আবার কইল, ‘চলেন না যাবেন?’
ওইলা কথাত কান না দিয়া ট্রামত উঠি যাওয়ায় বুদ্ধির কাজ হইল হয়, কিন্তু ক্যাংকা একটা দোটানাত পড়ি পাও বাড়াইতেই পারিলোঁ না, ট্রামখান মোড় ঘুরি মোর চোখের আগোত দিয়া ঘটর ঘটর করি চলি গেইল।
‘যাবেন তো?’
‘কোনটে তোমার বাড়ি?’
‘চেতলাত— এই কাছেই।’
‘কি হইছে, তোমার মাওয়ের?’
‘কি হইছে, জানোঁ না তো। বড় অসুখ।’
‘কয়দিন অসুখ?’
‘অনেকদিন। ডাক্তারবাবু, আপনি যাবেন তো।’
ছোঁয়ালিটার সোতাসোতা মুখের দিকে তাকায়া মোর ক্যাংকা মায়া নাগিল, ভাবিলোঁ যাই না, দেখি আসোঁ ব্যাপারটা।
কইলোঁ, ‘চলো।’
‘ডাক্তারবাবু, তোমাক মুঁই তো টাকা দিবার পামো না—’ ছোঁয়ালিটা আরো কিছু কবার যায়া ঢোক গিলি থামি গেইল।
‘আচ্ছা আচ্ছা, সেইতানে ভাবিস না’, মুঁই তাড়াতাড়ি কইলোঁ।
নয়া পাস করি বাইর হইছোঁ, আত্মীয় বন্ধু মহলত ডাক-খোঁজ পড়ে মাঝে মইধ্যে, কিন্তু ভিজিট দশ টাকা যে মাসত পাই, সেই মাসতেই খুব খুশি। এই তো বন্ধুর বেটার নিরানব্বই বুঝি জ্বর হইছে, ট্রামের পইসা খরচ করি আসি তার প্রেসক্রিপশন লিখি দিয়া এতখান আড্ডা মারি বাড়ি ফিরির ধরিছিলোঁ। তাও এই ছোঁয়ালিটায় যা হোক টাকার কথাটা মুখত আনিল।
হাঁটি রওনা হইলোঁ ছোঁয়ালিটার সঙে কালীঘাট পুলের দিকত। পুছিলোঁ, ‘তোমার মাওক আর কোনো ডাক্তার দেখেন নাই?’
‘ডাক্তার? না। মাও কয়, ডাক্তার দিয়া কি হইবে, এমনেই মুঁই ভালো হমো। টাকা পামো কোটে—’
‘তুই কি আজি ডাক্তার খুঁজিতেই বাইর হইছিলু? আর কাও নাই তোমার বাড়িত?’
‘নাঃ কায় আর থাকিবে। এক দাদা আছিল মোর, সেই তো চটকলত কাম করির যায়া রেলত কাটা পড়িল। সেই থাকি মুঁই আর মাও। ভালেই তো আছিলোঁ হামরা— এর মইধ্যত কেনে অসুখ করিল মাওয়ের? ডাক্তারবাবু, মাও কয়দিনত ভালো হইবেন?’
মুঁই ডাক্তারি ঢঙে হাসি কইলোঁ, ‘সেইটা এ্যালা ক্যাং করি কমো?’
‘ডাক্তারবাবু, আজি সকাল থাকি মাও যেন ক্যাংকা হয়া আছে— একবারও চোখ মেলি তাকায় না। দেখেন বাড়ি থাকি মুঁই বাইর হয়া দৌড়ি দৌড়ি এতদূর আসিছোঁ, যদি কোনো ডাক্তার খুঁজি পাই, যদি মোর উপর কোনো ডাক্তার দয়া করেন। ওই তো সব ওষুধের দোকান, ভিতরত প্যান্টুল পিন্ধা ডাক্তারগুলা বসি আছে— মোর তো সাহস হয় না ভিতরত ঢুকির। রাস্তার এদিক-ওদিক খালি ঘুরোঁ, এমন সময় তোমাক দেখিয়ায় মনে হইল আপনি মোক দয়া করিবেন। মাও সারি উঠিলে আপনি একদিন আসি খাবেন হামার বাড়ি; কি চমৎকার লাউয়ের পাতা দিয়া মটরডাল রান্ধেন মাও— ছি, ছি, এইটা কি কইলোঁ; তোমরা কেনে গরিবের বাড়িত খাবার আসিবেন? ডাক্তারবাবু, তোমার দয়া মুঁই কোনোদিন ভুলিম না।’
কিছুখান পর ছোঁয়ালিটা পুছিল,
‘ডাক্তারবাবু, তোমার হাঁটিত কষ্ট হয়?’
‘কিছু না, চলো।’
মুখে কইলোঁ বটে, কিন্তু কালীঘাট পুল পর্যন্ত আসিতেই মনে হইতে নাগিল এই মহৎ কামের ভারটা না নিলেই পারিতোঁ। এমন কত গরিব-দুঃখী আছে, বিনা চিকিৎসায় ধুঁকি মরে, না খায়া উমার সবার উপকার করির গেইলে নিজেরই –
পুল থাকি নামি পুছিলোঁ, ‘আর কতদূর?’
মোর প্রশ্নত নিতান্ত ব্যাকুল হয়া ছোঁয়ালিটা কইল, ‘এই তো— আর এখনা। মোর পইসা নাই, তালে নিশ্চয় তোমাক গাড়ি করি নিতোঁ। ওঃ কত কষ্ট হইল তোমার!’
‘বাঃ, এইটুকু হাঁটিবার পারিম না!’
অনেক গলি-ঘুঁজি পার হয়া শেষত আসি পৌঁছাইলোঁ। কলকাতার এই অঞ্চলত কোনোদিন আর আসোঁ নাই। সাচা কতা, জাগাটা ঠিক কলকাতায় নোহায়। এক্কেবারে গেরামের নাকান, পুখুর, বনজঙ্গল, কিছু পাকা বাড়ি, কিছু বা খড়ের ঘর। একটা অতি জীর্ণ শ্যাওলা ধরা খসি পড়া একতলা পাকা বাড়ির আগত ছোঁয়ালিটা আসি কইল, ‘এই।’
ভিতরত ঢুকি দেখোঁ, মেজির উপর মইলা বিছানাত একজন মাইয়া মানুষ নিঃসাড় হয়া শুতি আছে। চোখ তার আধা-বোজা, খানিক পর পর নিশ্বাস পড়ে জোরে জোরে।
ছোঁয়ালিটা তার কানের কাছে মুখ দিয়া ডাকিল, ‘মাও মাও’।
কোনো জবাব আসিল না।
‘মাও মাও তোমার তানে ডাক্তার নিয়া আসিছোঁ, চায়া দেখো। মাও এই ডাক্তারবাবু তোমাক ভালো করিবেন।’
চোখ দুইটা একবার পলকের তানে খুলি আবার বুজি গেইল, একখান হাত বুঝি এখনা উঠাইবার চেষ্টা করিল, অস্ফুট এখনা আওয়াজ হয়তো বাইরাইল গলা দিয়া।
ছোঁয়ালিটা কইল, ‘ডাক্তারবাবু, ভালো করি দেখেন, মাওক আজিই ভালো করি দেন।’
কিছু দেখিবার আছিল না। আর এখনা পরেই নাভিশ্বাস শুরু হইবে। তাও হামরা সবসময় একবার শেষ চেষ্টা করি থাকি।
তাড়াতাড়ি কইলোঁ, ‘তুই এখনা বইস, মুঁই আসোঁ।’
ছোঁয়ালিটা কইল, ‘ডাক্তারবাবু আপনি আবার আসিবেন তো? মোর মাও ভালো হইবেন তো?’
‘এ্যালায় আসোঁ ওষুধ নিয়া,’ কয়া মুঁই বাইর হয়া গেলোঁ।
ফিরিবার সময় রাস্তাটা বোধহয় কিছু গোলমাল হইছিল; এখনা ঘুরপথে আসি সেই বাড়ির আগত খাড়া হইলোঁ। রইদত দৌড়াদৌড়ি করি তখন মুঁই কানত পিপি আওয়াজ শুনির ধরিছোঁ। কিন্তু ডাক্তারের নিজের স্বাস্থ্যের কথা ভাবিবার তখন সময় নোহায়। ভিতরত ঢুকির ঠিক যেন পাও সরির ধরিছে না, কায় জানে যায়া কি দেখিম। দরজাটা খোলা দেখি ঢুকিলোঁ, কিন্তু ঢুকিয়ায় থমকি গেলোঁ।
তালে কি মুঁই ভুল বাড়িত আসিলোঁ? না, ওই তো সেই পুখুর, সেই সুরকির রাস্তা, ওই দুইটা সুপারি গাছ। দেড় ঘণ্টা আগত এই ঘরটাতেই তো আসিছিলোঁ ছোঁয়ালিটার সঙে, কিন্তু ছোঁয়ালিটা কোটে? তার মুমূর্ষু মাও-ই বা কোটে গেইল? ঘরত জিনিসপত্র অবশ্য খুব কমেই আছিল, কিন্তু যেই কয়টা আছিল, সেই কয়টায় বা কোটে?
তালে কি ওর মাও এর মইধ্যেই মরি গেইল, আর ওর মাওক নিয়া চলি গেইল কেওড়াতলাত। এত কম সময়ের মইধ্যত ক্যাং করি তা হইতে পারে? ঘরত কিছু জিনিসপত্র আছিল, একটা লন্ঠন, দুই-একটা থালা-বাটি সেগুলা?
আস্তে আস্তে মুঁই বাইরত আসি খাড়া হইলোঁ। তালে কি সমস্ত জিনিসটায় মোর চোখের ভুল…মনের ভুল? এই রইদত কি মোর মাথা খারাপ হয়া গেইল? এই তো মুঁই ঠিক খাড়া হয়া আছোঁ, মোর পকেটত ইঞ্জেকশন, সব ঠিক আছে না কি মুঁই পথ ভুল করি ভুল বাড়িত আসি হাজির হইছোঁ?
ফ্যালফ্যাল করি তাকি আছোঁ মাথার উপর যে আগুন ঝরির ধরিছে সেই খিয়ালও নাই। চাইরোদিক ছবির নাকান চুপচাপ। হঠাৎ দেখোঁ টাকপড়া একজন আধবয়সি মানষি মোর পাশত আসি তখন খাড়া হইছে। কোনোঠে কাও আছিল না, মানষিটা হঠাৎ মাটি ফুঁড়ি উঠি আসিল। তার দিকে তাকাইতেই সে কইল, ‘কি মশাই, বাড়িখান কিনিবেন নাকি?’
‘তোমার বাড়ি বুঝি?’
মানষিটা ঠোঁট উলটায়া কইল, ‘হ্যাঁ, আইনত মোরেই। কপালত দুর্ভোগ থাকিলে খণ্ডাইবে কায়! কোনটেকার এক বিধবা পিসি, জন্মত দুইবার চোখে দেখোঁ নাই মশাই— সংসারত কাও কোনোঠে নাই, আইনের প্যাঁচত ঘুরি ঘুরি বাড়িখান আসি পড়িল মোরেই ঘাড়ত। আর কন কেনে এমন কপাল নিয়াও আসে মানষি! পিসা টেসিলেন তিরিশ বছরত, কুড়ি বছরের বেটাটা রেলত কাটা পড়িল, পিসি যখন সগ্গে গেলেন, ভাবিলোঁ ভালোই হইল। একটা ছোঁয়ালি আছিল—’ হঠাৎ থামি গিয়া অন্যরকম সুরত মানষিটা কইল, ‘ওইলা মানষির কথাত কান দিবেন না মশাই, একদম বাজে কথা।’
মুঁই কথা কবার তানে হাঁ করিলোঁ, কিন্তু মোর গলা দিয়া আর আওয়াজ বাইরিবার আগতেই মানষিটা কইতে নাগিল, ‘ওই তো এক ফোঁটা বারো বছরের ছোঁয়ালি, তা মাওটা যেদিন অক্কা পাইল, তার পাছের দিন ও দিব্যি কড়িকাঠ থাকি ঝুলি পড়িল। একখানায় শাড়ি আছিল পরনত, সেটা দিয়া কাম সারিল। কি ডেপো ছোঁয়ালি মশাই! থাকিলে হামরা একটা বিয়া-টিয়া দিয়া দিতোঁ, বাড়িখান আছিল তিন পুরুষের, একরকম চলি যাইল হয়। তা মানষি যা কয় সব বাজে কথা মশাই— হ্যাঁ ভূত না হাতি। আপনি তো পড়ালিখা জানা মানষি, আপনেই কন, ওইলা কথাত কি কান দিবার আছে? নিবার চান তো খুব সস্তায় ছাড়ি দিমো। সবসুদ্ধ পাঁচশো টাকা— আচ্ছা হরেদরে চারশোই দিবেন, যান। পানির দরত পাবার ধরিছেন, জমিটুকু তো রইল, আপনি ইচ্ছা মতন বাড়ি বানায়া নিবেন।’
অতি ক্ষীণ স্বরত মুঁই পুছিলোঁ, ‘কয়দিনের কথা এইটা?’
‘কোনটা? এই পিসির… তা দুই বছর হইবে। পিসির তানে কোনো ভাবনা আছিল না মশাই, ছোঁয়ালিটার তানে বাড়িটার এমন বদনাম হইছে যে, পাঁচ টাকাতেও কাও ভাড়া নেয় না। এদিক ট্যাক্সো তো গুনির ধরিছোঁ মুঁয়েই। কি বিপদত পড়িছোঁ, গিলিবারও পারোঁ না, উগরাবারও পারোঁ না। মুঁই গরিব মানষি, মোর উপরত এই জুলুম কেনে? থাকোঁ কাঁচড়াপাড়াত, রোজ রোজ আসি যে তদবির করিম তারও উপায় নাই। আপনি নেন না বাড়িটা কিনি। আচ্ছা, কি দিবেন আপনেই কন … কন না!'
---
বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ
হালিচা:
ভুতের গপ্পো