দিনটা খিব ইন্টারেস্টিং – অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

সৌম্যর জ্যোতিষত কোনোদিনই বিশ্বাস আছিলো না। জ্যোতিষ মানেই ধাপ্পাবাজি, এই কথাত ও এক্কেবারে পাকা। সেই তানে পঞ্চগনি শহরর টেবলটপের নাকান সুন্দর একটা জাগাত গাড়ি থাকি নামিবারে না নামিবারে একটা জ্যোতিষী নাকান মানষি আগাই আসিল—সৌম্যর তো খুব রাগ উঠিবারই কথা! মানষিটাক পাশ কাটি যত জলদি পারে সৌম্য আগায় গেইল।

‘আপকা ভবিষ্যৎ বহোতি ইন্টারেস্টিং হ্যায়। মেরে সে শুন লিজিয়ে,’ পাছ থাকি কথাটা সৌম্যর কানত পড়িল। বউ আর দুইটা বেটা নিয়া বেড়াবার আইচ্চে, এইটেও এইলার হাত থাকি রেহাই নাই। বিরক্ত করি মারেছে। সামনত তাকাইতেই বিরক্তিটা উধাও হয়া গেইল। পাহাড়ের উপরত বিশাল বড় মাঠের নাকান সমান জাগা। টেবলটপের নাকান। উয়ার উপরেই উমরা খাড়া হয়া আছে। দূরত আরো কয়টা পাহাড়ের উপরত এমনি ন্যাড়া সমান জাগা দেখা যায়। দুইপাকে গভীর খাল সিধা নামি গেইচে। আরেকপাকে পাহাড়ের ঢাল গিয়া পঞ্চগনি শহরত মিশচে। এত দূর থাকিয়াও দেখা যায় চার্চ, একটা ভারি সুন্দর ইস্কুল, ইস্কুলঘরটার পাশত বিশাল মাঠ, একটা মন্দিরও। অল্প আগত একপশলা ঝরি গেইচে। সেই তানে আকাশটা বেশ সাফা। গরম কমি গেইচে। গাছের পাতাত রোদ্দুরের গয়না। সবুজে ঝিকমিক করে দূরর পাহাড়।

‘স্যার, আপকে বারেমে সবকুছ পতা হ্যায়। শুন লিজিয়ে,’ সৌম্যক এক্কেবারে খেদি বেড়ায় মানষিটা। ফির অগ্রাহ্য করি সৌম্য আগায় যায়।

মেলা মানষি, তবে দার্জিলিং-কালিম্পং এর নাকান ভিড় নাই। বাচ্চালাক ঘোড়াত চড়াবার তানে বারবার কয়। বেটালাক ঘোড়াত তুলি দিয়া নিজেও ঘোড়ার পাশত খাড়া হয়া মেলা ফটো তুলি নিল সৌম্য। পুরা জাগাটার ধার দিয়া গোল করি একবার ঘুরি আইল ঘোড়া। পাত্তা না পায়া ওই জ্যোতিষী নাকান মানষিটা ইতিমধ্যে হাওয়া হয়া গেইচে।

আরো মিনিট পনেরো ঘুরিফিরির পাছত গাড়িত উঠিবার যায়, আবার সেই জ্যোতিষী। ‘বহোৎ কুছ বোলনা বাকি হ্যায় স্যার। কালকা দিন আপকে লিয়ে বহোৎ হি ইন্টারেস্টিং হোগা।’

‘যাও তো ভাই, ওইলা ধাপ্পাবাজিত মুই বিশ্বাস করোং না।’ বিরক্ত হয়া প্রায় চিল্লায়া কইল সৌম্য। মানষিটা বাংলা বুঝিল কি না বুঝিল কে জানে! কিন্তু সৌম্য যে খুব বিরক্ত এইটা অন্তত বুঝিবার পারিচে আর কি! পঞ্চগনি, মহাবালেশ্বর হয়া উমরা যেলায় পুণাত পৌছিল সেলায় মেলা রাতি হয়া গেইচে।

পরের দিন বিকালত পুণা থাকি কলকাতা যাবার ট্রেন। দশ দিন বেড়েয়া কলকাতা ফেরা। পরের দিন প্রায় এক ঘন্টা আগত স্টেশনত পৌছি গেইল সৌম্য। আধা ঘন্টা আগত ট্রেনও আসি গেইল প্ল্যাটফর্মত। উমরা উঠি পড়িল ট্রেনত। এসি টু-টায়ার। সিটলা ছড়ায়া ছিটায়া পড়িচে। বউ আর বেটালার সিট এক জাগাত হইলেও সৌম্যর সিট মেলা দূরত, তবে একে কোচত।

উমারলাক বসেয়া মালপত্র গুছায়া থুইয়া কিছুক্ষণ পাছত নিজের সিটত আসি বসিল সৌম্য। সাইডের সিট। একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক সিটের আরেক পাকে বসি আছে। দেখি ইউরোপিয়ান নাকান লাগে। মাথাত ঝাঁকড়া সোনালি চুল, লম্বা জুলফি, বাদামি চউখ, গোঁফ নাই। রোগা পাতলা চেহারা। একবার সৌম্যর পাকে তাকি মাথা ঝুকায়া হাসিল বুলি মনে হইল। সেটা যেলায় খেয়াল হইল সৌম্যর একনা দেরি হয়া গেইচে। ফিরতি অভিবাদনটা করা হইল না। উল্টাপাকে বসি আছে একটা বড় মাড়োয়ারি পরিবার। উমারলার সাথত একবার কথা কবার চেষ্টা করিল সৌম্য। যদি বউ আর বেটালার সিটলা ইমারলার সাথত পাল্টা যায়। বৃথা চেষ্টা। ইমরা বেশ গুছায়া গাছায়া, চাইরোপাকে নানান রকম খাবার দাবার ছিটায়া, ল্যাপটপত হিন্দি ফিল্মি গান বাজায়া বসি আছে। সৌম্য ব্যর্থ হয়া ফিরি আইল।

সিটত ফিরি আসি হিন্দুস্থান টাইমসের পুণা এডিশনটা নিয়া পড়িবার শুরু করিল সৌম্য। বাইরত এখনো ভালই আলো আছে। এইপাকের প্রকৃতি বেশ রুখা। ছোট ছোট টিলা পাহাড়, ছোট ছোট গাছ আগাছা। বাংলার মাঠ প্রান্তরের নাকান সবুজের সমারোহ নাই। পাশত বসা মানষিটা মাথার কাছের আলো জ্বালায়া একটা লাল ডায়েরি হাতত নিয়া পড়ে, বেশ গোপন করি। ওইটা কি বই? নাহ, উপরত কিছু লেখা নাই। তাইলে ডায়েরিই হবে। কিন্তু উয়াত সাল টাল কিছুই লেখা নাই। মানষিটার সাথত একবার চউখাচউখি হইল। টের পায়া মানষিটা ডায়েরিটা যেন আরো সাবধানে আঁকড়ি ধরিল। একনা লজ্জা পায়া আবার খবরের কাগজের পাকে চউখ ফিরাইল সৌম্য। বাইরের দেশের মানষি কী ভাবিল কে জানে? নিশ্চয় একনা সতর্ক হয়াই থাকে উমরা, ভারত সম্বন্ধে নানান ধরনের খবর তো রটেই।

এই কয়দিন পুণে, বম্বে, গোয়া, পঞ্চগনি-মহাবালেশ্বর-মাথেরন এইলা নানান জাগাত ঘুরিবার যায়া কোনো কিছুই খোঁজ খবর রাখা হয় নাই। গোগ্রাসে তাই খবরলা পড়িছিল। হঠাৎ টিকিট চেকার আসি হাজির হওয়াত বাধ্য হয়া কাগজটা নামায়া টিকিটটা বাইর করিল সৌম্য। ভদ্রলোক বাঙালি।

‘কোনোভাবে কি মোর পরিবারের সিটলার কাছাকাছি একটা সিট পাওয়া যাইবে? উমরা এক্কেবারে আরেক পাকত।’

‘সেটা আপনাক প্যাসেঞ্জারলার সাথত কথা কয়া দেখিবার নাগিবে। মুই কবার পারিম না। এই একটা সিটেই খালি মানষি নাই। বাকি সবই তো ভর্তি।’ কয়া ভদ্রলোক সৌম্যর উপরর বাঙ্কের পাকে দেখাইল।

‘আরে! এইটে তো এই অল্প আগতেও একজন মানষি ছিল। এইটে বসি ছিল। মুই ভাবিনু উপরর সিটটা উয়ারই। বিদেশি, এই এক্ষুনি ছিল।’

চেকার একনা অবাক হয়া সৌম্যর পাকে তাকাইল। নাহ, কাহো তো নাই। কোনো লাগেজও নাই।

সত্যিই, উয়ার নিজের ছোট ল্যাপটপের ব্যাগটা ছাড়া আর কোনো ব্যাগই নাই এইটে। চউখের ভুল? না না, তা নিশ্চয় নোয়ায়। নির্ঘাত কাহো ভুল কোচত উঠিচিল। পাছত ঠিক জাগাত চলি গেইচে। তাও ভাল। আর কাহো না উঠিলে বড় বেটা শান্তনুক এইটে ডাকি নেওয়া যাইবে। একনা চেসও খেলা যাইবে। সিটের উপরত পাও তুলি বেশ আরাম করি কাগজটা খুলি বসিল সৌম্য।

পাওটা ছড়ায়া বসিবার যায়াই মনে হইল কোনো একটা বই এর উপরত পাও দিয়া বসিচে। কাগজটা সরায়া তাকাইল সৌম্য। ডাইন পাওয়ের তলাত একটা লাল ডায়েরি, যেইটা ওই মানষিটা পড়িছিল। ফেলি গেইল নাকি? নিছক কৌতূহলত ডায়েরিটা হাতত তুলি নিল সৌম্য। ডায়েরি ঠিক নোয়ায়, নোটবুক। কিন্তু মজার কথা হইল কোনো পাতাত কিছু লেখা নাই। দুই মলাটের মাঝত খালি লাইন টানা ফাঁকা পাতা, এক বিন্দু পেনের দাগও পড়ে নাই কোটে। আশ্চর্য! তাইলে মানষিটা পড়িছিলটা কী?

ডায়েরিটা পাওয়ের কাছত নামায়া রাখিবার যায়া আবার থমকি গেইল সৌম্য। পাওয়ের কাছের আলোটা জ্বলে। উয়ার তলাত ডায়েরিটা ধরিতেই ডায়েরির উপরত একটা সংখ্যা দেখা যায়। রোমান হরফত ১৮০৪, আরে কী কো-ইন্সিডেন্স! ওইটাই তো সৌম্যর জন্মদিন, ১৮ এপ্রিল। একবার এপাক ওপাক তাকায়া নিল সৌম্য। নাহ, কাহো লক্ষ করে না। উল্টাপাকের যাত্রীলা পর্দা টানি দিচে, আর বেশ একটা লারেলাপ্পা হিন্দি গান শোনা যায় ওইপাক থাকি। উয়ার সাথত তারস্বরে গান জুড়িচে একটা বেটি।

অর্থাৎ নিশ্চিন্তে আবার ডায়েরিটা দেখা যায়। টুক করি নিজের পাকের পরদা টানি নিয়া আলোর নীচত ডায়েরিটা ধরিল সৌম্য। স্পষ্ট ১৮০৪ লেখা উপরত। ডায়েরির পয়লা পাতা আর ফাঁকা নাই।

উয়াত ইংরেজিত বড় বড় করি খালি একটা লাইন লেখা, ‘তুই কি নিজেকে ভুলি গেছিস?’ অবাক হয়া পাতা উল্টাইল সৌম্য, পরের পাতা। আবার একটা লাইন, ‘তুই আমারাই একজন সৌম্য।’

এসির ঠান্ডা যেন আরো বেশি টের পায় সৌম্য। একী, উয়ার নাম ক্যানে ডায়েরিত! পরের পাতা, আবার এক লাইন, ‘ওরা মানুষ, তুই মানুষ নোস।’ তার পরের পাতাত মেলা ছোট অক্ষরত মেলাগুলা লাইন, ‘তুই আমারার এক্সপেরিমেন্টের অংশ। আমরা জানিবার চাইছিনু যে এই গ্রহ আমারার বাসযোগ্য কিনা। এমনিতে অবশ্যই নোয়ায়। সেই তানে আমরা আমারার জিনত সামান্য পরিবর্তন আনি তোক তৈরি করছিনু। তার পাছত নিয়া আইছিনু এইটে। তা এক্সপেরিমেন্ট সফল। আমারার জিনত সামান্য চেঞ্জ। ব্যস, আমরা এইটে বহাল তবিয়তত থাকিবার পারিম তোর নাকান। এইটে এত অক্সিজেনত দমবন্ধ হয়া যাইবে না।’

পরের পাতাত আর কিছু না দেখি ডায়েরিটা আবার উল্টায়া পাল্টায়া দেখিল সৌম্য। নাহ, আর কিছু নাই।

ভয়ত গলা শুকায়া কাঠ হয়া গেইচে। এইলা ভূতুড়ে কথার মানে কী? লেখাটা কি ঠিক? ও কি সত্যিই পৃথিবীর মানষি না? সৌম্য কোনো কালেই পাও মুড়ি বাবু হয়া বসিবার পারে না। অথচ এক পাওয়ে দিব্যি আধা ঘন্টা খাড়া হয়া থাকিবার পারে। এইটা কি সাধারণ মানষি কোনোদিন করিবার পারে?

‘তোর ভাবনা ঠিক। তুই মেলাদিক দিয়াই অন্যরকম,’ চমকি উঠে সৌম্য। এত মন দিয়া ডায়েরির পাতা উল্টাছিল যে খেয়ালই করে নাই, কখন আবার সেই মানষিটা পাওয়ের কাছত আসি বসিচে।

‘এই যে তুই জিভ দিয়া নাকের ডগা ছুঁইবার পারিস, ডাইন হাতের আঙুল দিয়া পিঠের যেকোনো অংশ ছুঁইবার পারিস, কিংবা মানষি আয়নাত কোনো লেখা যেমন উল্টা ভাবে দেখে ঠিক সেই নাকান যেকোনো কিছু লিখি ফেলিবার পারিস, সেইলা কি সাধারণ মানষির পক্ষে সম্ভব? কখনোই নোয়ায়। এই যে ভয় পাইলে তোর মাথার চুল খাড়া হয়া যায়, শরীরের চামড়া হলদেটে হয়া যায়, এই যে খাড়া হয়া হয়া ঘুমায়া পড়া, এইলাও মানষির পক্ষে সম্ভব নোয়ায়।’

সবই সত্যি। মানষিটা স্পষ্ট বাংলাত মৃদু স্বরত কয়া যায়। নেহাৎ লাজুক কয়া এই কথালা কখনো কাকো কবার পারে নাই সৌম্য। এই মানষিটার তো কোনোভাবেই জানার কথা নোয়ায়। তাইলে কি ওক পৃথিবী ছাড়ি নিজের গ্রহত ফেরাবার তানেই আইচ্চে মানষিটা?

মানষিটা বোধয় থটরিডার। সাথত সাথত কয়া উঠিল, ‘না, তোক পৃথিবী ছাড়ি যাবার নাগিবে না, তুই এইটেই থাকিবু, আমারার একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে। আমারার গ্রহ আর বাসযোগ্য নাই।’

‘সেকী! তাইলে তোমরা!’

‘আমরাও আর নাই। একটা সময়ত আমারার গ্রহ মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির সব থাকি উন্নত গ্রহ ছিল। তোমরা এখন যেমন, তার থাকিয়াও কয়েক হাজার গুণ আগায়া ছিল, কিন্তু আমরা নিজেই নিজেক ধ্বংস করি ফেলিনু।’

‘কী করি?’

‘জলের অভাবত। বেহিসাবি হয়া আমারার গ্রহের সব জল আমরা শেষ করি ফেলিছিনু। যে সামান্য জলটুকু পড়িছিল তা নিয়া নিজেরার মাঝত যুদ্ধবিগ্রহ শুরু হইল। সে ভীষণ নিউক্লিয়ার ওয়ার। পরমাণু যুদ্ধ যেলায় থামিল, সেলায় জলও নাই, প্রাণও নাই,’ মানষিটা চুপ করি রইল মিনিট দুই। তার পাছত কয়া উঠিল, ‘আর সেই তানে তোক সাবধান করিবার আইচ্চোং। তোমরাও যদি জলের ব্যাপারে সচেতন না হন, তোমারলারও অবস্থা একেই হইবে। আজ থাকি কুড়ি বছরর মাঝত তোমারলার সব পানীয় জল শেষ হয়া আসিবে। জলের স্তর মেলা নামি যাইবে। চাষবাসের তানেও কোনো জল অবশিষ্ট থাকিবে না। আজ যেইটে ধানজমি দেখিস, সেথায় কাইল থাকিবে মরুভূমি। সামান্য যেটুকু জল থাকিবে তা নিয়া বাড়িত বাড়িত ঝগড়া হবে। রাজ্যে রাজ্যে নদীর জল ভাগাভাগি নিয়া মারামারি হবে। দেশে দেশে যুদ্ধ হবে। যেইলা দেশ খুব ধনী, উমরাই কোনোমতে চালাবার পারিবে। তা সেও বা কদ্দিন!’

‘তা মুই কী করিম?’

‘সবাকে কও জল বাঁচাবার। যারা জল নষ্ট করিবে উমারলাক বুঝাবু। তুই নিজেই তো প্রচুর জল নষ্ট করিস। দেড়ঘন্টা ধরি গান গায়া গোসল করিস। গানটাও ভাল করি করিস না। কলটাও ঠিকমতো বন্ধ করিস না।’

একনা লজ্জা পাইল সৌম্য, ‘কিন্তু মুই, মোর কথা মানষি শুনিবে ক্যানে?’

‘হয়তো একদিনে শুনিবে না, কিন্তু যেলায় দেখিবে যে তুই জল নষ্ট করিস না, তোর কথার মাঝত যুক্তি আছে, সেলায় আস্তে আস্তে শুনিবে। একজন দুইজন থাকি হাজার। হাজার থাকি লক্ষ মানষি। তুই-ই পারিবু সে পরিবর্তন আনিবার। তোর হাত ধরিই পৃথিবী বাঁচিবে।’

‘তা এইটা কবার তানেই তুই আইচ্চিস এইটে?’

‘উঁহু, আরেকটা কথা ছিল, অত গুরুত্বপূর্ণ নোয়ায়। পৃথিবীক নিয়া নোয়ায়, তোক নিয়া। তুই উঠি গিয়া উল্টাপাকের চেনটা টানি ট্রেন থামা। সামনত রেলের লাইনত মাইন পোঁতা আছে। ব্লাস্টত ট্রেন উড়ি যাইবে। আমরা চাই না আমারার শেষ প্রতিনিধি আর উয়ার পরিবার শেষে এক অ্যাক্সিডেন্টত হারায়া যাক।’

সৌম্য অবাক হয়া কয়েক সেকেন্ড বসি রইল। মানষিটা ফির কয়া উঠিল, ‘কী বিশ্বাস হয় না? আর কিন্তু ঠিক এক মিনিট বাকি।’

নাহ, মানষিটার কথা অবিশ্বাস করার নাকান নোয়ায়। এত কিছু যেলায় ঠিকঠাক কইচে। লাফায়া উঠি পরদা সরায়া সৌম্য উল্টাপাকে চলি গেইল। বাঁ পাকের উপরর বাঙ্কের একনা উপরত চেনটা। চাইরোপাকের সবাকে হতবাক করি দিয়া লাল হ্যান্ডেল ধরি মারিল এক টান।

‘আরে ক্যা হুয়া, ক্যা হুয়া’ কাকের নাকান চিল্লায়া উঠিল বিশাল ভুঁড়িওয়ালা মাড়োয়ারি ভদ্রলোক।

কোনো উত্তর না দিয়া সৌম্য গট গট করি এসি কোচের বাইরের প্যাসেজত বাইর হয়া আইল। সাধারণত এইটে সবসময় ট্রেনের একজন অ্যাটেন্ড্যান্ট থাকে, এখন নাই। অল্পক্ষণের মাঝতেই নিশ্চয় ট্রেনের মানষিলা চলি আসিবে। পুছিবে ক্যানে চেন টানা হইচে। ক্যানে ট্রেন থামানো হইচে। সেলায় কারণটা কওয়া যাইবে। আপাতত এইটেই অপেক্ষা করা যাউক।

বেসিনত একটা বিশাল চেহারার মাস্তান টাইপের মানষি হাত ধোয়। ধোয়ার পাছত দিব্যি কলটা খুলি থুইয়াই চলি যাছিল। সৌম্য উয়াক আটকাইল, ‘ভাই জল নষ্ট করিবার নাই,’ কয়া কলটা বন্ধ করি দিল। মানষিটা ঠিক সহজে বুঝার নাকান মানষি নোয়ায়। জোর দেখাবার তানেই আবার ফিরি আইল। কলটা জোর করি খুলিবার গেইল। কিন্তু এবার মজাটা হইল। কলের জলটা নীচের পাকে না নামি সিধা উয়ার জামার পাকে ছুটি আইল। মানষিটা ভ্যাবাচ্যাকা খায়া কোনোরকমে কল বন্ধ করিল। কী ভাবিল কে জানে! জোরে ঘুঁষি পাকায়া সৌম্যক মারিবার আইল।

ওই একটা ঘুঁষি সৌম্যর রোগা পাতলা চেহারাত পড়িলে আর দেখিবার নাগিত না। কিন্তু পড়িল না, কারণ ঘুঁষিটা সৌম্যর মাথার উপর দিয়া চলি গেইচে আর গিয়া পড়িচে ট্রেনের বাথরুমের দরজাত। সৌম্য হঠাৎ উচ্চতাত প্রায় একফুট ছোট হয়া গেইচে।

‘উহু’, কয়া মানষিটা ওইটেই বসি পড়ি বাঁ হাত দিয়া ডাইন হাতটা চাপি ধরি কাতরাবার নাগিল।

ব্যাপারটাত সৌম্য যতটুকু অবাক হইচিল, তার থাকিয়াও অবাক হইল, যেলায় দেখিল যে ও আবার আস্তে আস্তে লম্বা হইবার শুরু করিচে। এক মিনিটের মাঝতেই আবার আগের উচ্চতাত ফিরি আইল সৌম্য।

ট্রেনের ওই বিদেশি সহযাত্রী এতক্ষণে আবার সশরীরে আসি উপস্থিত। সৌম্যর পাশেই আসি খাড়া হইচে। কইল, ‘এক্ষুনি মানষিলা আসি পড়িবে। কয়া দিবু ঠিক কুড়ি মিটার দূরত রেললাইনত মাইন পোঁতা। উমরা ঠিক খুঁজি পাইবে। কী করি জানিনু পুছিলে মোর কথা কবু।’

‘আপনার কী পরিচয় দিম? কে বিশ্বাস করিবে মোর কথা?’

‘হুঁ, তা ঠিক, কও ভূত। অ্যালিয়েন কইলে, অন্য গ্রহ থাকি আইচ্চোং কইলে কাহো বিশ্বাস করিবে না। ভূত কইলে বিশ্বাস করিবে। আর তা ছাড়া’, কয়া বসি থাকা মাস্তান মানষিটার কান্দো কান্দো মুখের পাকে তাকায়া কইল, ‘অ্যাই, মুই যে ভূত সে ব্যাপারে সাক্ষ্য দিবার পারিবু?’

কোনো সাড়া না পায়া ফির কয়া উঠিল, ‘তোর গোঁফটা ভারী বিচ্ছিরি। কেমন গা ঘিনঘিন করে,’ কয়া মুখের সামনত হাত নাড়িতেই গোঁফ ভ্যানিশ হয়া গেইল।

সাধের গোঁফ হারায়া আর এইলা ভূতের কীর্তি দেখি মানষিটা ইতিমধ্যে ভেউ ভেউ করি কান্দিবার শুরু করিচে।

‘নাহ, গোঁফ সরানোটা ঠিক হয় নাই। তোর মাথাত এত ঝাঁকড়া চুল এর সাথত মানায় না। চুলটা না থাকিলে মানাবেও পারে,’ কয়া মাথার দুই ইঞ্চি উপর দিয়া আরেকবার হাত বুলাইল। মুহূর্তে মানষিটার কায়দা করা চুল উধাও। চকচকা ন্যাড়া মাথা।

‘বাহ, এবার বেশ নাগে। ভুরু না থাকিলে আরও ভাল নাগিবে।’ কয়া কোনো কথা কবার সুযোগ না দিয়া আরেকবার মুখের সামনত হাত নাড়াইল। এবার ভুরুও উধাও।

মানষিটা এবার জ্ঞান হারায়া ট্রেনের মেঝেত পড়ি গেইল। দীর্ঘশ্বাস ফেলি অ্যালিয়েনটা কইল, ‘দেখলু এখন কেমন ফুটফুটে নাগে একে। ওইটে মোর একটা সেলুন ছিল।’ অ্যালিয়েনটা এবার সৌম্যর পাকে আগায়া আসি কইল, ‘ওই সে সাক্ষীও পায়া গেলু! কইবু যে ভূত আসি তোক ট্রেন থামাবার কইচে। পৃথিবীর মানষিলা অ্যালিয়েন না মানিলেও ভূতক বেশ মান্যিগণ্যি করে। আর তা ছাড়া অ্যালিয়েন কইলে প্রচুর হইচই শুরু হয়া যাইবে। তুইও ধরা পড়ি যাবার পারিস।’

‘কিন্তু আপনি তো অ্যালিয়েন, ভূত নোন!’

‘অ্যালিয়েনও বটে, ভূতও বটে। অ্যালিয়েনলা মরিলে কি আর ভূত হয় না, খালি মানষি মরিলেই ভূত হয়? কত কমন সেন্সের অভাব দেখ। ভূত হইলে তবেই তো এই গ্রহ থাকি ওই গ্রহত যাওয়া এত সোজা, জলভাত হয়া যায়, তাই না!’

‘কিন্তু...’

‘কইনু না? আমারার গ্রহ আর নাই। গ্রহের সবাই মরি গেইচে। মুই-বা বাঁচি থাকিম কী করি? মুই হইনু অ্যালিয়েন মরি ভূত, বুঝলু?’

একনা থামি ফির কয়া উঠিল, ‘আর জলের কথাটা জলত ফেলিস না।’ কয়া মানষিটা সৌম্যর হাঁ করা মুখের হাঁটা আরেকনা বাড়ায়া দরজার মাঝত মিলায়া গেইল।

নাহ, এবার থাকি জ্যোতিষত বিশ্বাস করিবে সৌম্য। আজিকার দিনটা অন্য কোনো দিনের নাকান নোয়ায়। খিব ইন্টারেস্টিং।


–---অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
বুলিবদলঃ ভাওয়াইয়া ব্লগ

Post a Comment

Previous Post Next Post