অনেকদিন পাছত ব্যাট ধরির নামছুং বুলিয়া মনটাত একনা টেনশন আছিল। তাও বল করিছে হামার গাঁয়ের স্বরূপ। আগোত অন্য দলটা এত রান করিছে, উয়ার আধা করির পাইলে বুঝিম ম্যাচখান জিতি গেইছি।
মোর পাশত তখন রিতু খাড়া — মানে মোর খুড়তুতো বইন। উয়ায় মোক সাহস দিবার বদলতে খালি খোঁচা মারি যায়। উয়ার বয়স মাত্র সাত। ক্রিকেটের কিচ্ছু বোঝে না। খালি বোঝে, মোর মনখান ভাঙি দিলে মুই ব্যাট ছাড়ি দিম।
এইটা পড়ি তোমরা ভাবি না বসেন যে মুই কোন বড় টুর্নামেন্ট খেলিবা ধরছুং। এইটা গাঁয়ের ছোট টুর্নামেন্টও নাহয়। বড় মাঠ, ছোট মাঠতও নাহয়। খেলিবা ধরছি মোর জেঠাবাবুর বাড়ির উঠানত। আর দর্শক কায়? একঝনাই — মোর বইন রিতু।
যাউক, স্বরূপ বলখান করিল। মুই চখু বুজি ব্যাট চালি দিলুং। চখু খুলি দেখং বল চার হইছে। কিন্তুক বলখান পড়ছে জেঠাবাবুর পিয়ার বাগানত। যেখানত পড়ছে, সেখানত লতা-পাতার জঙ্গল, আর আছে এক কুমড়া গাছ।
সগায় গেলি বল খুঁজিবা। কিন্তুক ওই বনত, সরি সুন্দর বাগানত, বলখান খুঁজি পাওয়া বড় মুশকিল। হামার ক্যাপ্টেন রিন্টু দা কইল, “মঙ্গল দা, ব্যাট দিয়া একনা চাইরপাকে চটিয়া দেখো।” কিন্তুক কুমড়া গাছটার ক্ষতি হইতে পারে।
মঙ্গল দা মোর একটায় জেঠুর বেটা। উয়ায় কইল, “নিশ্চয় দেখিবি, ক্যানে দেখিবি না।” এইটা শুনি রিন্টু দা যেই পাও বাড়াইছে, মঙ্গল দা কইল, “কিন্তুক একটা পাত ভাঙিলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা নিম।” তা শুনি রিন্টু দা হাত গুটাইল।
সেদিনের মতন খেলা শ্যাষ। সগায় যার যার বাড়ি গেইল। যাবার আগত স্বরূপ কইল, “খেলাটা হইলে কিন্তুক জিতির পাইতিস না।” মুই কিছুই কইনু না। ক্যানে, মুই তো ভাল করি জানং। মোর তেমন খেলাধুলা হয় না। মাঝে মাঝে গাঁয়ের বাড়ি আসং তখনি খেলং।
মুই তো কিছু দূরোত সদর শহরত থাকং মা-বাবার সাথত। আর এইঠে থাকেন কাকু আর জেঠুর পরিবার। গাঁয়ের বাড়ি আসিলে মুই কাকুর ঠেই থাকং। এইবার আসছুং কালীপূজার বাদে। গাঁয়ের বাড়ি কম আসিলেও বন্ধু অনেক আছে। আর আছে এই গাঁয়ের সাথত এক অদ্ভুত নাড়ির টান। কিন্তুক আসল গল্প এইটা নাহয়। আসল ঘটনাটা ঘটে সেদিন রাইতত।
রিতু আর মুই সইন্ধ্যাবেলা গাঁয়ের এক কালী মন্দিরত যাই। কালীপূজার দিন পোতিবছর প্রদীপ দিয়া গোটা মন্দিরটা সাজায়। বড় সুন্দর নাগে দেখির। বড় একটা আলপনার নাকান প্রদীপ থুইয়া তেল আর সলতে দিয়া বানায়। ছোটলায় মোমবাতি হাতত সলতে জ্বালায়, আর বড়লায় সাজি দেয়।
বড় মজা হয়। প্রদীপ নিভি গেইলে সগায় ছুটি যায় জ্বালিবার। মোর বইন ওমার সাথত কাম করে, মুই বড়লার সাথত গপ্প করির ধরছুং। এমন সময় কিছু দূরোত একটা গোলমাল দেখি হামরা বড়লায় গেলি। ছোটলাক কয়া গেলি, “প্রদীপগুলা যেন না নিভে, সেইটা দেখিস।” ওমরা দায়িত্ব পাইয়া বড় খুশি, আরও ব্যস্ত হই গেইল।
সেঠে যাইয়া যা শুননুং তা বড় দুঃখের। যে বাড়ির সামনত খাড়া আছি, সেই বাড়ির একটা বাচ্চা ছাওয়ার আচমকা শ্বাসকষ্ট হয়। উয়ার মা স্বামীক কইলে, উয়ায় গাড়ির ব্যবস্থা করিবার আগোতে ছাওয়াটা মরি গেইল।
সদর ছাড়া ভাল ডাক্তার নাই। গাঁয়ের ডাক্তার দেখি কইল, “সদরত নিয়া যাও, মোর পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নাহয়।” গাঁয়ত একটায় গাড়ি, সেইটা আবার গেইছে অন্য গাঁয়ত। ফিরি আসিবার আগোতে ছাওয়াটা মরি গেইল।
মনটা আরও খারাপ হইল, যখন শুননুং বাচ্চা ছাওয়াটার একটা দিদি আছে, উয়ায়ও ছোট। মন্দিরত প্রদীপ জ্বালায়। বাচ্চাটার মা-বাপ কান্দে। গরিব পরিবার। ছাওয়াটার বাপ নিজে দিনমজুরের কাম করে।
যাউক, বাচ্চাটার দিদিটা আসিল, বড় কান্দিল। উয়ায় কইল, “ভাই ওঠ, কাইল ভাইফোঁটা। তোর বাদে নতুন জামা, খেলনা কিনছুং।” আর থাকির পানু না। রিতুক নিয়া দূরত সরি গেলুং। বাড়ি আসি সেদিনের মতন কাটি গেইল।
রাইতত খাবার বসি কাকুর মুখত শুননুং, চার বছরের বাচ্চা, তাই জঙ্গলের কোনোঠে নাকি পুঁতি থুইয়া আসছে। পাঁচ বছর না হইলে নাকি পোড়াবার নিয়ম নাই। আর শ্মশানত পুঁতিলে মানুষ ভয় পাইতে পারে।
সেদিন রাইতত বাচ্চাটার দিদির কথাগুলা বার বার মনত আসির ধরিল।
তার পাছত তিন-চার দিন কাটি গেইল। পাড়ার মোড়ত মোড়ত ঘটনাটা নিয়া অনেক আলোচনা হইল। মোর এবার বাড়ি ফিরিবার সময় হই আসিছিল। যেদিন ফিরিম তার আগের দিন বিকালবেলা বাড়িত খাবার পানি শ্যাষ হই গেইল।
হামার গাঁয়ের কলের পানি ভাল নাহয়। তাই খাবার পানি আনির নাগে পাশের গাঁও থাকি। এমনিতে কাকু আনে, কিন্তুক মুই আসার পাছত থাকি মুইয়ে আনি দেং। ভাল নাগে কাম করির। আর ভাল নাগে সাইকেলত চড়ি দুই সারি গাছের মাঝোত মাটির রাস্তা দিয়া পাশের গাঁওত যাবার।
এই অনুভূতিগুলা বড় সুন্দর। শহরের কোলাহল থাকি দূরোত এই শান্তিটা প্রাণ ভরি দেয়। সেই বাদে সুযোগ পাইলে মুই গাঁয়ের বাড়িত চলি আসং।
পানি নিবার জাগাত পৌঁছিতে পৌঁছিতে সূর্য ডুবিল। এমনিতে এই কলের পানি অনেকেই নেয়, ভিড় থাকে। কিন্তুক এই সময়টাত কেও নাই। একলায় দুইটা বড় পাত্র নিয়া গেছিলুং পানি আনির। একলায় একলায় ভরেছুং।
একলায় আসছুং ক্যানে, কাকু তখনও অফিস থাকি ফিরে নাই। আর বইন খেলির গেইছে। পানি ভরি সেগুলা সাইকেলত নিয়া সাইকেল চালি আগির ধরনুং। সাইকেলের সামনত লাইট থাকায় পথ দেখির অসুবিধা হয় নাই।
এমনিতে জঙ্গলত বাঘ-ভালুক থাকে না। শিয়াল আর খরগোশ তিনটা অনেক আছে। মাঝে মাঝে হাতি আসি পড়ে, কিন্তুক এ্যালা উমার আসিবার সময় নাহয়।
আচমকা রাস্তাত একটা কিছু দূর থাকি হালকা আলোত দেখির পানুং। ভাবনুং শিয়াল। সামনত আসিতে বুঝনুং একটা বাচ্চা ছাওয়া। গাঁও দূরোত না হইলেও বড় কাছতও নাহয়।
ভাবনুং কারো সাথত আসছে। উয়াক পুছনুং, “তুই একলায় এইঠে কি করিস?” উয়ায় কইল, “মায়ের বাদে খাড়া আছুং।” মুই পুছনুং, “কোটে তোর মা?” উয়ায় কইল, “বাড়িত। তুই মোর মাক কয়া দিস, দুঃখ না করির। মুই তাড়াতাড়ি ফিরিম।”
মুই কনুং, “কোন গাঁওত বাড়ি তোর? চল, পৌঁছি দেং।” উয়ায় ছুটি জঙ্গলত হারি গেইল। মাথা-মুণ্ডু কিছু বুঝির পানু না। মুই নিজের গাঁয়ের রাস্তা ধরনুং।
ভাবনুং, কোন মানষির বদ মতলব থাকির পারে। বাচ্চাটার পাছত গেইলে হয়তো মোকেই চোরের পাল্লাত পড়ির নাগে। কিন্তুক সাথত কিছুই আছিল না। তাও কাক ডাকি আনি বিপদ বাড়ির চাং না। পরদিন মুই মা-বাপের কাছত ফিরি গেলুং।
তার পাছত মুই কলেজের পড়ার বাদে কলকাতাত ভর্তি হইয়া সেঠে চলি গেছিলুং। বাপ-মায়ের সাথেই দেখা হয় না। পড়ার চাপ বাড়ি যাওয়ায় গাঁয়ের বাড়ি যাওয়া হয় নাই।
তিন বছর পাছত শ্যাষ পরীক্ষা দিয়া বাড়ি ফিরনুং। কয়দিন থাকি গাঁয়ের বাড়ি যাইম যাইম ভাবির ধরছুং। একদিন সকাল সকাল বাইর হই পড়নুং। সেঠে পৌঁছি কাকু, জেঠু সগার সাথত দেখা হইল।
বিকালত গাঁওত ঘুরির বাইর হইনুং। অনেকদিন পাছত সগার সাথত দেখা হইল, অনেক গপ্প হইল। আগের বারের সেই ক্রিকেট খেলার গপ্প হইতে হইতে আচমকা মনত পড়িল সেই সইন্ধ্যার বাচ্চাটা মরি যাবার কথা। পুছনুং, “ওমার বাড়ির সগায় কেমন আছে?”
ওমরা কইল, “ছাওয়াটা মরি যাবার পরের বছর ওমার বাড়িত আরো একটা ছাওয়া হইছে। অবাক কাণ্ড জানিস, সেই ছাওয়াটা হুবহু উয়ার মরা দাদার নাকান দেখির।”
কথাটা শুনিবার পাছত মোর কানত সেই দিন রাইতত রাস্তাত দেখা বাচ্চাটার কথা ভাসি উঠিল — “তুই মাক কয়া দিস... মুই তাড়াতাড়ি ফিরিম।”
লেখকঃ ঋজু
বুলি বদলঃ ভাওইয়া ব্লগ।
হালিচা:
ভুতের গপ্পো